বুদ্ধদেব বসুর স্মৃতিচারণায় নোয়াখালির বিখ্যাত ‘শর’

২৬৮ পঠিত ... ০৪:২৫, ডিসেম্বর ০২, ২০১৯

 

নোয়াখালির মেঘনা নদী 

নোয়াখালির মেঘনার মতো এমন হতশ্রী নদী পৃথিবীর অন্য কোথাও আমি দেখিনি। রুক্ষ পাড়ি, ঘাট নেই কোথাও, কেউ নামে না স্নান করতে। কোনো মেয়ে জল নিতে আসে না। তরণীহীন, রঙিন পালে চিহ্নিত নয়, জেলে-ডিঙির সঞ্চরণ নেই—একটিমাত্র খেয়া-নৌকো দেহাতে ব্যাপারিদের নিয়ে সকালে-সন্ধ্যায় পারাপার করে। শহরের এলাকাটুকু পেরোলেই নদীর ধারে-ধারে ঘন বনজঙ্গল, নয়তো শুধু বালুডাঙা, মাঝে-মাঝে চোরাবালিও লুকিয়ে আছে—শীতে গ্রীষ্মে বিস্তীর্ণ চরের ফাঁকে-ফাঁকে শীর্ণ জলধারা বয়ে যায়। বর্ষায় স্ফীত হয়ে ওঠে নদী—বিশাল—অন্য তীর অদৃশ্য; কিন্তু তখনও চোখ খুশি হতে পারে না, বরং আমার ভয় করে সেই কালচে-ব্রাউন বিক্ষুব্ধ জলরাশির দিকে তাকাতে—যার উপর দিয়ে, বর্ষার ক-মাস, একটি নিঃসঙ্গ স্টিমার যাতায়াত করে হাতিয়া-সন্দ্বীপে—পৃথিবী-ত্যক্ত দুই দ্বীপ, যেখান থেকে প্রায়ই ভেসে আসে সর্পদংশনের ভীষণ সব কাহিনী। ভাদ্র-আশ্বিন মাসে ঝড়ের সংকেত আসে মাঝে-মাঝে, ঘূর্ণি হাওয়ায় এঁকে-বেঁকে পাতলা বৃষ্টি পরে সারাদিন। আর এই সবকিছুর উপরে আছে—ভাঙন, অনিবার্য অপ্রতিরোধ্য ভাঙন। প্রতি বর্ষায় নদী এগিয়ে আসে শহরের মধ্যে—প্রায় লাফিয়ে-লাফিয়ে—বিরাট বুড়ো বটগাছ আর অগুনতি পাখির বাসা নিয়ে মস্ত বড়ো মাটির চাঁই ধ্বসে পড়ে হঠাৎ, ধোঁয়া ওঠে জলের মধ্যে কয়েক মুহূর্ত, তারপরই নদী আবার নির্বিকার।  

আমি একাধিকবার এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হয়েছিলাম—একবার কিছুটা বিপজ্জনকভাবে। শোনা গেলো অমুক সাহেবের বাংলোকে নদী ধরে ফেলেছে, তিনি সব জিনিসপত্র শস্তায় বেচে দিয়ে চলে যাচ্ছেন। রোববার সকালে দাদামশাই আমাকে নিয়ে হাজির হলেন সেখানে, আমার পড়ার মতো কোনো বই যদি বা পাওয়া যায়। আমরা যখন একমনে বই দেখছি, ঠিক তখনই প্রচণ্ড শব্দে পাশের ঘরটি ধ্বসে পড়লো—একটি ফিরিঙ্গি যুবক জানলা দিয়ে লাফিয়ে পড়ে প্রাণ বাঁচাল, বরাতজোরে সে-ঘরে তখন আর কেউ ছিল না। মুহূর্তের মধ্যে সব লোক বেরিয়ে এলো রাস্তায়, দাদামশাই কাঁপতে-কাঁপতে আমার হাত ধরে বাড়ির পথ ধরলেন, কিন্তু তার আগেই তিনি জুটিয়ে ফেলেছিলেন আমার জন্য এক বান্ডিল বাছা-বাছা বই।  

এই বাংলোটি ছিলো শহরের দক্ষিণ প্রান্তে—আমার ছেলেবেলার নোয়াখালির সেটাই অভিজাত পল্লী। সুন্দর বেড়াবার রাস্তা, উর্ধ্বতন সরকারি চাকুরেদের জন্য বড়ো-বড়ো কম্পাউন্ডওলা বাড়ি, পানীয় জলের জন্য সুরক্ষিত চোখজুড়ানো ‘বড়ো দিঘি’—এই সব ছিলো সেখানে, আর আমি কিছুটা বড়ো হয়ে উঠতে উঠতে এই সবই জলের তলায় অদৃশ্য হয়েছিলো। আমরা যখন নোয়াখালি ছেড়ে চলে আসি তখন নদী প্রায় শহরের মধ্যিখানে এসে পড়েছে। যে-নোয়াখালিতে আমি ছিলাম, যার মানচিত্রের একটি রেখাও আমার মনে ঝাপসা হয়নি এখনো, সেটিকে এখন অবলুপ বলে ধরে নিলে আমি বোধহয় ভুল করব না।

 

মেঘনার ধ্বংসপরায়ণ ‘শর’ 

কিন্তু এই ধ্বংসপরায়ণ মেঘনাই নোয়াখালিকে দিয়েছিলো তার সংবৎসরের শ্রেষ্ঠ দৃশ্য, বৃহত্তম ঘটনা—তার ডার্বি, তার রথের মেলা, তার মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল ফাইনেল। প্রতি বছর ভাদ্র মাসের অমাবস্যায়, মধ্যাহ্নের কোনো-এক লগ্নে সমুদ্র থেকে বান আসে নদীতে—স্থানীয় ভাষায় বলে ‘শর’। 

ঘরে-ঘরে সেদিন সকাল থেকে চাঞ্চল্য, একটা উৎসবের ভাব। আমার যতদূর মনে পড়ে, স্কুলগুলোতে ছুটি থাকতো কিছুক্ষণ, কাচারি-আদালতেও কাজকর্ম স্থগিত—সেই সময়টুকুর জন্য সকলেই সেদিন নদীর ধারে, অন্তঃপুরিকা মহিলারাও ভালো কাপড় পরে দিনের আলোয় বেরিয়ে এসেছেন। যতদূর মনে পড়ে, দিনটি থাকতো প্রতি বছরই রৌদ্রোজ্জ্বল। আমরা দাঁড়িয়ে আছি পূর্বদিগন্তে তাকিয়ে—শান্তাসীতার মোহনার দিকে—যেখানে ম্নাল-সবুজ বনরেখার পরে মস্ত একটা দুয়ার যেন খুলে গেছে, আকাশ নুয়ে পড়েছে জলের উপর—তাকিয়ে আছি সেই ঝাপসা-ধোঁয়াটে অগ্নিকোণের দিকে, সেখান থেকে অগ্নিবর্ণ সূর্যের উদয় শীতের ভোরে অনেকবার আমি দেখেছি, আর যেখান থেকে, একটু পরেই, যে-কোনো মুহূর্তে, সমুদ্রের ঢেউ ছুটে আসবে আমাদের চোখের সামনে। ঐ আসছে। 

দুধের মতো শাদা একটি ফেনিল রেখা প্রথমে, তারপর শোঁ-শোঁ শব্দে সমুদ্রে এলো ঝাঁপিয়ে—মস্ত বড়ো নদীটা যেন দুলে, ফুলে, গর্জে উঠে আরো অনেক প্রকাণ্ড হয়ে ছড়িয়ে পড়লো—তার বিস্তার জুড়ে হাজার ঘোড়ার দাপাদাপি, হাজার স্টিমারের এঞ্জিন যেন পাকে-পাকে ছিটিয়ে দিচ্ছে তার ফেনা, তার ঘূর্ণি, তার সব নীল কালো বেগুনি বাদামি শাদা রঙের ঝলক—দুপুরবেলার রোদ্দুরে আরো উজ্জ্বল—এক বিপুল রঙ্গ ঢেউ তুলে-তুলে পশ্চিম দিকে ছুটে চলে গেলো। দৃশ্যটির মেয়াদ হয়তো পাঁচ মিনিটের বেশি হবে না, কিন্তু লোকেরা তা নিয়ে বলাবলি করে অনেকক্ষণ—কেমন হলো এবার, আগের বছরের চাইতে ভালো, না কি এবারে তেমন জমলো না?

জীবনে আমি প্রথম যে-কবিতাটি লিখেছিলাম, সেটি এই নদীর সঙ্গেই সম্পৃক্ত। 

একবার আমরা ছিলাম এমন একটি বাড়িতে, যা নোয়াখালির সবচেয়ে ভালোর মধ্যে একটি—পূর্বোল্লিখিত দক্ষিণপ্রান্তিক অভিজাত পাড়াতেই। নোয়াখালিতে এটা আমাদের চতুর্থ বাসা, পাকাবাড়ি এটাই প্রথম ও একমাত্র। কিন্তু ‘বড়ো বাড়ি’ বলতে মধ্যবিত্ত বাঙালির মনে যে-ছবি ফোটে এটি ঠিক সে-রকম নয়; এর মাপজোক গড়নপেটনের সঙ্গে আমাদের তখনকার বাঁ এখনকার ধারণার কোনো মিল নেই। যাকে বলা হয় ‘কলোনিয়াল স্টাইল’, লোকেরা বলে ডেলনি-হাউস—আদি যুগে খুব সম্ভব কোনো হার্মাদ—মানে পর্তুগীজের কুঠি। 

আমরা যখন প্রথম এলাম, তখন দক্ষিণের বারান্দা থেকে নদী দেখা যায়, কিন্তু প্রথম বর্ষা কেটে যাবার পরেই নদী অনেক এগিয়ে এলো, দ্বিতীয় বর্ষায় বরোদের মুখে বলাবলি শুনলাম এ বাড়িতে আর বেশিদিন থাকা যাবে না। একদিন সন্ধেবেলা দক্ষিণের ছোটো ঘরে বসে হঠাৎ একটি কবিতা লিখে ফেললাম—ইংরেজিতে। ছ-সাত স্ট্যানজার কবিতা—প্রথমটা আমার মনে আছে এখনো—

Adieu, adiey, Deloney House dear, 

We leave you because the sea is near,

And the sea will swallow you, we fear,

Adieu, adieu

 

[বুদ্ধদেব বসুর আত্মজৈবনিক রচনা ‘আমার ছেলেবেলা’ থেকে সংকলিত] .

২৬৮ পঠিত ... ০৪:২৫, ডিসেম্বর ০২, ২০১৯

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top