জোকার নিয়ে দুনিয়ার মানুষ হোয়াই সো সিরিয়াস? জানতে এই লেখাটা সিরিয়াসলি পড়ুন

৭১৭ পঠিত ... ১৪:৫৩, অক্টোবর ২৫, ২০১৯

আইকনিক ফিকশনাল চরিত্র জোকারের সবচাইতে বিখ্যাত ডায়লগ ‘হোয়াই সো সিরিয়াস?

‘সিরিয়াস কেন হইতেছেন?’ এই লেখা ‘সিরিয়াস কেন হইতেছি’র সংক্ষিপ্ত ফিরিস্তি।   

নায়কের চাইতে ভিলেন জনপ্রিয়- ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল। জোকারের ক্ষেত্রে এইটাই ঘটছে। নায়ক ব্যাটম্যানের চাইতে ভিলেন জোকারের জনপ্রিয়তা অনেক বেশি। আমি প্রচুর লোক পাইছি, বিশেষত ইয়াংদের মধ্যে, যাদের সবচাইতে প্রিয় সিনেমা চরিত্র জোকার।

অনেকরেই আমি যখন প্রশ্ন করতাম, জোকারের সাথে আপনি কি আইডেন্টিফাই করেন? এইটা জেনেবুঝে যে সে একজন সাইকোপ্যাথ? নিহিলিস্ট, ভায়োলেন্ট এনার্কিস্ট? জোকারের ঠিক কোন দিকটা আপনারে টানে?  

বেশিরভাগ সময় তারা বিব্রত হইতো। মজার ব্যাপার হইতেছে, এরা কিন্তু মিথ্যাবাদী না। জোকাররে আসলেই তারা পছন্দ করে চরিত্র হিসেবে। হয়তো জোকারের সাথে নিজেদের আইডেন্টিফাই করে। এ ব্যাপারে সন্দেহ নাই চরিত্র হিসেবে জোকার তাদেরকে স্পর্শ করে। বোঝার চেষ্টা করতেছি তাদেরকে কীভাবে আর কোন কোন দিক দিয়া স্পর্শ করে এই সাইকোপ্যাথ চরিত্র।

জোকাররে নিয়া মন্তব্য করার একটা ঝামেলা হইতেছে এই সংকটে পড়া যে, আমরা কোন জোকারের কথা বলবো? ১৯৪০ সালের ‘ব্যাটম্যান’ নামের কমিক-এ সূচনার পর থেকে সুপার ভিলেইন হিসাবে অনেক রকম জোকার দেখা গেছে। খুবই স্বার্থপর লোভী, পেটি,  ক্রিমিনাল জোকার থেকে শুরু করে রেপিস্ট, নিহিলিস্ট, এনার্কিস্ট, এস্টাবলিশমেন্ট বিরোধী জোকার পর্যন্ত অনেক রকম জোকারের দেখা মিলছে। একেকজন লেখক, আর্টিস্ট একেক রকম জোকার বানাইছেন। জোকারের ৭৯ বছরের ইতিহাসে অসংখ্য কমিকের পাশাপাশি ইতিমধ্যে ৫টা ফিচার  ফিল্ম হইছে। সর্বশেষ টড ফিলিপস পরিচালিত হোয়াকিন ফিনিক্স অভিনীত ‘দ্য জোকার’।   

পপ কালচারে জোকারের যে ভার্সন সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করছে, তার শুরুটা এলান মুরের ১৯৮৬ সালের কমিক ‘দ্য কিলিং জোক’, এইখানে প্রথমবারের মতো জোকারের ব্যাকস্টোরি পাওয়া যায়। এর বাইরে ক্রিস্টোফার নোলানের মুভি ‘দ্য ডার্ক নাইট’-এর হিথ লেজার অভিনীত জোকারের ইমেজও পপ কালচারে মোটামুটি স্থায়ী। ক্রিস্টোফার নোলান আর এলান মুরের জোকারের মধ্যে অমিলের চাইতে মিলই বেশি। এই লেখায় যে জোকার নিয়া কথা বলবো, মুলত নোলান আর মুরের জোকাররে ভেন ডায়াগ্রামে ফালাইলে যে কমন বা সাধারণ বৈশিষ্ট্যওয়ালা জোকাররে পাবো তারে নিয়া।

মুরের বর্ণনায়, জোকার একজন ব্যর্থ কমেডিয়ান। কর্মক্ষেত্রে একটা দিন তার খুবই খারাপ যায়, তারপর জানতে পারে তার প্রেগনেন্ট স্ত্রী মারা গেছে, জনতা তারে অপরাধী সাজায়। এইগুলাই সব না, জোকার গিয়া পড়ে কেমিকেলের ভ্যাট-এর মধ্যে। তো, এই বয়ানে জোকারের যে কঠিন বিশ্বাস যে ‘একটা খারাপ দিনই’ যেকোনো ‘স্বাভাবিক’ মানুষরে বন্য জন্তু বানায়ে দেয়ার জন্যে যথেষ্ট- তার এক ধরণের পটভূমি পাওয়া যায়। একটা মাত্র খারাপ দিন আপনাকে জোকারে পরিণত করতে পারে, যার কাছে সবকিছুই তুচ্ছ, সবকিছুই অর্থহীন। ভালো আর মন্দের মধ্যে কোনো তফাৎ নাই। সবকিছুই একইরকম ক্লান্তিকর আর হাস্যকর। এই পরিস্থিতিতে জোকার হয়ে ওঠে এক অশুভ কিন্তু ‘ইন্ট্রেস্টিং’ চরিত্র।

জোকার চরিত্রটারে অন্তত মোটা দুইটা দাগে দেখা যায়। প্রথমত ব্যক্তিগত দর্শনের জায়গা থেকে। দ্বিতীয়ত রাজনৈতিক দর্শনের জায়গা থেকে।  

ব্যক্তিগত দর্শনের জায়গা থেকে বলা যায় ডার্ক নাইটের জোকার স্বভাবে একজন নিহিলিস্ট।  নিহিলিজমের কাঁচা বাংলা নিরর্থবাদ। কিছুটা সরলীকরণ করলে বলা যায়, একজন নিহিলিস্টের কাছে মানব জীবনের কোন অর্থ নাই। সামাজিক নিয়ম, রীতি নীতির কোন অর্থ নাই। ওসব বিভ্রম। 

নীৎসে যখন ‘গড ইজ ডেড’ বলেন, অনেকে সেইটারে নাস্তিকতার গুণগান হিসেবে পাঠ করে, যা ভুল পাঠ। নীৎসের ‘ঈশ্বর মৃত’ কথাটা মুলত ল্যামেন্টেশন বা হাহাকার। একটা সময় ছিলো মানুষ ভাবতো সে সবকিছুর কেন্দ্রে, তার আছে গুরুত্ব ও গৌরব। তার প্রত্যেকটা কাজ সামগ্রিকভাবে কিছু অর্থ তৈরি করে। জীবনের মানে আছে। সায়েন্টিফিক রেভোলুশন তার সেই বিশ্বাসের জগত ভেঙে চুরে ফেলছে। আধুনিক মানুষ, মহাজাগতিক বিশালতার মাঝে তার জীবনের ক্ষণস্থায়ীত্ব, ক্ষুদ্রত্ব, তুচ্ছতা আর অনিবার্য অসহায়ত্বকে যখন পুরোপুরি টের পায়, ভয়াবহ অর্থহীনতা তাকে গ্রাস করে।  নীৎসে সারাজীবনে যা কিছু লিখছেন, সবসময়ই তার চিন্তার কেন্দ্রে ছিলো এই ভারী-ব্যাপক অর্থহীনতার মুখোমুখি সে কীভাবে হইতে পারে, কীভাবে নিহিলিজমরে অতিক্রম করবে? -এই জিজ্ঞাসা। সমাধান হিসেবে নীৎসে প্রস্তাবিত উবারমেনশ-এর মতো উদ্ভট আইডিয়া খুব একটা কাজে আসে না। 

প্রতিটি মানুষই জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে এই অর্থহীনতার মুখোমুখি হয়। জোকার ২৪ ঘন্টা এই অর্থহীনতার ব্যাপারে সজাগ। তার কাছে সমাজ, রাষ্ট্র, যৌথকল্যাণ, মানবতা, গণতন্ত্র,  ইত্যাদি ভারী ভারী শব্দের কোনো মূল্য নাই। এইগুলা তার কাছে কেবলি ফক্কিকার। এইসব রীতি-নীতি, সামাজিক-রাজনৈতিক নিয়ম-কানুন, অনুষ্ঠান-প্রতিষ্ঠান জোকারের কাছে ‘ফালতু জোক’ ছাড়া কিছু না। তার কাছে, ভেড়ার পালের মতো বিশাল জনগোষ্ঠীরে নিয়ন্ত্রণ করতে উদ্ভাবন করা হইছে এইসব। এইসব এ্যাবসার্ড মানবিক প্রতিষ্ঠান ও আইনকানুন নৈতিকতার শাসনের সে বিরোধিতা করে। জোকার তাই যেকোনো ‘শুভবোধ’-এর  বিরোধী। ফলে সে ক্লাউনের মেকাপ নিলেও ক্লাউন না।

এ্যাবসার্ডিটি আর হিউমারের ভেতরের সম্পর্ক নিয়া বিশদে লিখছেন দুঃখবাদী জার্মান দার্শনিক আর্থার শোপেনহাওয়ার। তার বই ‘দ্য ওয়ার্ল্ড এ্যাজ উইল এন্ড রিপ্রেজেন্টেশন’-এ। ‘হাসি সবক্ষেত্রেই, সহজ ভাষায় বললে, কনসেপ্ট আর রিয়াল বস্তু বা বাস্তবতার মধ্যেকার যে অসঙ্গতি তারই অনুধাবন’। গথাম সিটির মানুষদের কাছে যে অবস্থা খুব স্বাভাবিক বলে মনে হইতো, যে স্বাভাবিকতা/সুস্থতা ধরে রাখতে হিরো ব্রুস ওয়েইন বা ব্যাটম্যান মনেপ্রাণে কাজ করে, তা যে ফাঁপা, তা যে অন্তঃসারশূন্য পঙ্কিলতায় নিমজ্জিত, জোকারের কাজকর্ম তারে নগ্ন করে।

ফলে আপাতভাবে যা দর্শকদের বেশিরভাগের কাছেই মিনিংলেস সহিংসতা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি মনে হয় তা জোকারের কাছে আনন্দের। হয়তো মিনিংফুলও। 

বিখ্যাত ফিল্ম নির্মাতা ওয়ার্নার হেরজগের ছেলে রুডলফ হেরজগের বই ‘ডেড ফানিঃ হিউমার ইন হিটলার’স জার্মানি’। হিটলারের আমলে এমনকি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পেও বন্দিরা জোক করছেন, হাসি-ঠাট্টা করছেন। রুডলফের একটা দাবি, ‘যেকোনো দুর্যোগ বা বিপর্যয়ের পরে, হিউমার প্রায়ই অসহনীয় ভয়াবহতার বিপরীতে এন্টিডোটের কাজ করে।’’  

হিটলারের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পগুলোর বন্দিদের মধ্যে একটা জোক জনপ্রিয়তা পাইছিল। খুব যে ফানি জোক তা না। রুডলফ অবাক হইছেন যারা শীঘ্রই মারা যাবে তাদের কাছে এরকম একটা জোক কীভাবে এতো জনপ্রিয়তা পাইলো। জোকটা মোটামুটি এমন: 

হিটলার একটা পাগলগারদে গেছে। রোগীরা প্রত্যেকে প্রথামাফিক তারে স্যালুট দিল। হঠাৎ হিটলার খেয়াল করলো একজন তারে স্যালুট দেয় নাই। হিটলারে তারে প্রশ্ন করলো, তুমি আমারে দেখে বাকিদের মতো স্যালুট দিলা না কেন?
লোকটা বললো, ফুয়েরার, আমি একজন আর্দালি, পাগল না। 

জোকার সেই নিহিলিস্ট যে জীবনের অর্থহীনতায় হাসতে পারে এ্যাবসার্ডিটির হাসি। মার্কিন দার্শনিক জন মার্মিজ দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন, নিহিলিস্ট দর্শন এবং সাংস্কৃতিক জগতে নিহিলিজমের প্রভাব নিয়া। নিহিলিস্ট দর্শনের সাথে হাস্যরসের সম্পর্ক নিয়া মার্মিজ লিখছেন বই ‘ লাফিং এ্যাট নাথিং: হিউমার এ্যাজ এ রেস্পন্স টু নিহিলিজম।’ মার্মিজ মনে করেন, জোকারের মতো লোকেরা যাদের ‘একটা খারাপ দিন’ জীবনরে তছনছ করে দিয়ে যায়, তারা জীবনের এ্যাবসার্ডিটি অনুধাবন করে ‘আনন্দ’ পেতেই পারে, কারণ তারা বিশ্বাস করে ‘একটামাত্র খারাপ দিন’ সবচাইতে সভ্য লোকটাও সহিংসতায় বন্য হয়ে উঠতে পারে।   

প্রত্যেকের একটা লক্ষ্য থাকে, আকাঙ্ক্ষা থাকে কোনো কিছু পাওয়ার। তা ভিলেন বা হিরো যেই হোক না কেন। জোকার কিন্তু এই ছাঁচে পুরাপুরি খাপ খায় না। অর্থনয় কীর্তি নয় স্বচ্ছলতা নয়, আরও এক বিপন্ন বিস্ময় টাইপের  জিনিস তার অন্তর্গত রক্তের ভেতরে খেলা করে। এই বিপন্ন বিস্ময় জোকারের ক্ষেত্রে হয়তো, ক্যাওস সৃষ্টি করা, নৈরাজ্য তৈরি করা। ফলে জোকাররে যাদের ভালো লাগে, তারাও আসলে কেউ জোকারের মতো হইতে চায় না। অথবা ভেতরে ভেতরে হইতে চাইলেও সামাজিক চাপের ভয়ে স্বীকার করতে ভয় পায়। 

জোকার মানুষের বানানো কোন আইন বা নিয়ম মানে না। যেকোনো কর্তৃত্ব বা প্রতিষ্ঠানের কাছে  কোনোভাবে নতি স্বীকারে সে রাজি না। জোকারের বিশ্বাস যদি কোন অথরিটি না থাকে এবং তাদের স্বার্থের উপর আঘাত আসে তখন আপাতভাবে ‘সভ্য’ মানুষেরাও বন্য হয়ে উঠবে।  

এক জায়গায় ব্যাটম্যানরে জোকার বলতেছে, দেখো, তাদের (গথামের লোকজন) নৈতিকতা, তাদের ‘কোড’ ... হইতেছে ফালতু জোকের মতো... তারা ততটুকুই ভালো যতটুকু এই দুনিয়া তারে হইতে দেয়। তোমারে দেখাইতেছি। চিপস খুলে ফেললেই, এরা, আহা, এই ‘সভ্য লোকেরা’, একে অন্যেরে জাস্ট খায়া ফেলবে। আমি কোনো দানব না। জাস্ট কার্ভে আগায়ে থাকা লোক। ... এই দুনিয়ায় একমাত্র অর্থপূর্ণ জীবনযাপন হইতেছে নিয়ম-নীতিহীন যাপন।

এইখানে আসে জোকারের রাজনৈতিক দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা। 

শৃঙ্খলা বা বিধিনিষেধ না থাকলে মানুষ যে সহিংস হয়ে উঠতে পারে এমন সন্দেহ রাজনৈতিক দর্শনের ইতিহাসে অতি পুরাতন। মূলত আধুনিক রাষ্ট্রের উদ্ভবের যে কয়টা থিয়োরি দেয়া হইছে সোশ্যাল কনট্রাক্ট থিয়োরি তার মধ্যে অন্যতম। প্রথমে টমাস হবসের সামাজিক চুক্তিতত্ত্ব এবং এর পরে জন লক এবং জা জাক রুশো আরও গণতান্ত্রিক সামাজিক চুক্তির প্রস্তাব করেন।

ব্রিটিশ দার্শনিক টমাস হবস, তার বিখ্যাত বই এই বিধি-নিষেধ মুক্ত সমাজরে বলছেন ‘স্টেট অফ নেচার’। তার মতো এই ‘প্রকৃতি রাজ্য’ আদিম, নিষ্ঠুর, সংহিসতায় নিমজ্জিত। ফলে এই নৈরাজ্যময় পরিস্থিতিতে ‘শান্তি শৃঙ্খলা’ রাখতে সমাজের জনগোষ্ঠী সার্বভৌম ক্ষমতা দিয়ে শাসক নিয়োগ দেয়, যার কাছে মানুষ কিছু কিছু স্বাধীনতা ত্যাগ করতো।

প্রাচীন কাল থেকে ফারাও বা রাজতন্ত্রের সমাট্রেরা ছিলো এই সার্বভৌম, প্রশ্নহীন ক্ষমতার অধিকারী। ডিভাইন বা ঈশ্বরিক ক্ষমতাবলে তার রাজা বলে দাবি করতেন, যে ঈশ্বর রাজাকে দেশ শাসনের অধিকার দিছেন। সুতরাং মানুষের উচিৎ রাজাকে মানা, রাজার জারিকৃত আইনকানুন মেনে চলা। হবস নিজে ঈশ্বরে বিশ্বাস করতেন না, তাই তিনি বললেন সামাজিক চুক্তির কথা। সমাজের জনগোষ্ঠী অনেক সমাজের কল্যাণের জন্যেই তাদের স্বাধীনতার কিছু দিক খর্ব করবে, রাজা/শাসকের আইন প্রয়োগের বা শাস্তি দেওয়ার ব্যাপারে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা মেনে নেবে। আর শাসকও তার রাষ্ট্রযন্ত্রের সহায়তায় জনগণের কল্যাণ দেখবে। এই হলো রাজার সঙ্গে মানুষের সামাজিক চুক্তি। তো, জন লক বা জাক রুশো রাজা/শাসক/রাষ্ট্রপ্রধানের এই সার্বভৌম ক্ষমতারে বেশি প্রশ্নবিদ্ধ করছেন। তাদের কথা রাজারেই বরং জনগণের কাছে জবাবদিহীতা করতে হবে, চাইলে তারা রাজারে সরায়ে নতুন রাজাও বানাইতে পারবে, যে নতুন রাজা তাদের ‘সামষ্টিক আকাঙ্ক্ষা’ বা জেনারেল উইল বাস্তবায়ন করবে।  সামাজিক চুক্তির তত্ত্ব নিয়া বিশদে যাওয়ার সুযোগ এই লেখায় নাই, তবে এই ফাঁকে বলে রাখা ভালো আধুনিক রাষ্ট্রের ধারণার বিবর্তনে এই সামাজিক চুক্তির ধারণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।  

যা হোক, হবসের মতে, সার্বভৌম রাষ্ট্রে আস্থা না রাখলে সমাজে নৈরাজ্য আর সহিংসতা কমানো যাবে না। তো, সামাজিক চুক্তির পেছনে মানবস্বভাব সম্পর্কে হবসের যেমন অনুমান, মানুষ যে প্রকৃতিগতভাবে সহিংস, ইন্টেনশনের ভিন্নতা সত্ত্বেও মানুষের সম্পর্কে ডার্ক নাইটের জোকারের অনুমানও তেমন। ফলে, জোকার দুটি ফেরিতে বোমা রেখে গথাম শহরের মানুষকে পরীক্ষায় ফেলে দেয়। এই ক্ষেত্রে জোকারের অনুমান ভুল প্রমাণিত হয়, লোকজন পরস্পররের বোমায় উড়ায়ে দেয় না। এইটা ব্যাটম্যানের জয় মনে হইতেই পারে যে মানুষ মৌল স্বভাবে ভালো প্রাণী। জোকারের যে বিশ্বাস ছিলো ‘চিপস খুলে ফেললে’ই অর্থাৎ বিধিনিষেধ না থাকলে, আর স্বার্থে ঘা লাগলে এই মানুষ সহিংস হয়ে ওঠে, তা ভুল প্রমাণিত হইলো।  

মজাটা এইখানে। সুপার ভিলেন হিসেবে জোকারের অসামান্য হয়ে ওঠার কারণ এইখানে নিহিত। আপাতভাবে মনে হইতে পারে জোকার ভুল ভাবছেন মানবস্বভাব সম্পর্কে। কিন্তু আসলেই কি জোকারের পরাজয় হইছে? হার্ভি ডেন্টের ব্যাপারে কী বলবেন? 

গথামের সেই হার্ভি ডেন্ট, ‘হোয়াইট নাইট’ যার প্রতি শহরবাসী নিরঙ্কুশ আস্থা, যে ছিলো হিরো উউদাউট এ মাস্ক, যে শত শত ক্রিমিনালরে জেলে পুরে রাখছিলো সেই হার্ভি ডেন্টের কী আশ্চর্য রূপান্তরই না ঘটে! হার্ভি ডেন্ট পাঁচ জন লোককে খুন করে, তাদের মধ্যে আবার দুইজন পুলিশ। আর খুন করার তরিকাই বা কেমন? লোকজনের জীবন নিয়া রীতিমত জুয়া খেলে হার্ভি ডেন্ট। লোকজন জানতে পারে না, কারণ ব্যাটম্যান নিজে ব্লেইম নিয়ে নেয়। তবুও জনগণের আস্থা কিন্তু ব্যাটম্যান ঠিকই হারায়। 

এইটা তো এক অর্থে জোকারের বিশ্বাসের বিজয়ই। ব্যাটম্যানের চাইতে কিছু জায়গায় জোকার যে আগায়ে থাকে তার কারণ ব্যাটম্যানের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। তার আবেগ আছে, কিছু নৈতিকতার বোধ আছে। জোকারের ওসব বালাই নাই। চরিত্র হিসাবে জোকার এতো ইনট্রিগিং, এতো মানুষের মনে দাগ কাটতে পারছে, কারণ চরিত্র হিসেবে সে খুবই আনপ্রেডিক্টেবল। তার কোনো নির্দিষ্ট চরিত্র নাই, স্বভাব নাই। টাকা পয়সার প্রতি তার লোভ নাই, ব্যাংকলুটের টাকা সে আগুনে জ্বালায়ে দেয়। খ্যাতি, ক্ষমতা ইত্যাদির প্রতি তার লোভ নাই। লোভ থেকে ওইসব দিয়া তারে কেনা যাইতো। তার চাওয়া, ‘ইন্ট্রোডিউসিং কেওস’। নৈরাজ্যের সূচনা করাই তার কাজ। তার কাজ মানুষরে কনভিন্স করা যে এইসব নৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ভারী ভারী প্রতিষ্ঠান ফাঁপা, গালগল্প, মানুষ চাইলে এইসব কোড ও রিচুয়ালের বাইরে যাইতে পারে।  

জোকার খুবই কমপ্লেক্স এক চরিত্র। ক্রাইমের পেছনে, টাকা-পয়সা, জাগতিক আকাঙ্ক্ষাসহ যে অন্যান্য সাধারণ মোটিফ থাকে লোকের, জোকারের ক্ষেত্রে তেমনটা নয়। সে ক্লাউনের মেকাপ নিয়া থাকে, মুখে তার পার্মানেন্ট হাসি, কিন্তু সে ক্লাউন না। যে ত্রাস সে সৃষ্টি করে তা মতাদর্শিক। তার মোটিভেশন ফিলসফিকাল। ফলে গথামের দুনিয়া বদলায়ে ফেলা জোকার হয়ে ওঠে অস্বস্তিকর এক দার্শনিক ধারণার প্রতীক। এই অস্বস্তি দর্শকদেরও কোনো না কোনো সময়ে জীবনের ভাবনার সাথে কিছু মাত্রায় মিলে যায় বলেই, জোকার তাদেরকে স্পর্শ করে। একজন নিহিলিস্ট সাইকোপ্যাথ এবং ভায়োলেন্ট এনার্কিস্ট তাদের প্রিয় ফিকশনাল চরিত্র হয়ে উঠতে সমস্যা হয় না।

৭১৭ পঠিত ... ১৪:৫৩, অক্টোবর ২৫, ২০১৯

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top