বন্যা কবলিত এলাকায় যারা ত্রাণ নিয়ে যাচ্ছেন, তারা যেসব ব্যাপারে অবশ্যই সতর্ক থাকবেন

৮২ পঠিত ... ১৬:০৮, জুলাই ২৭, ২০১৯

আবারও উত্তরবঙ্গে প্রবল বন্যা। এবার বর্ষা কিছুটা আগে চলে আসায় অনেকেই ঠিক প্রস্তুত ছিলেন না এমন বন্যার জন্য। বন্যায় আক্রান্ত লক্ষ লক্ষ মানুষ। বন্যায় মৃত্যুর সংখ্যাও প্রায় একশ। এই সংকটে, তাদের সাহায্য করার জন্যে দেশের সব প্রান্ত থেকেই ত্রাণ নিয়ে অনেক স্বেচ্ছাসেবক দল ছুটে যাচ্ছে বন্যাপীড়িত এলাকায়। যারা ত্রাণ দিতে যাচ্ছেন, বিপদগ্রস্থ মানুষের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে যেয়ে নিজেরাই যাতে কোন বিপদে না পড়ে যান তার জন্য, কী করবেন আর কী করবেন না, একটু ভালো করে জেজে নিন। যদি জানা থাকে, চোখ বুলিয়ে নিন আরও একবার।

১# বন্যাপীড়িত অঞ্চলে সাপের ব্যাপারে সাবধান থাকবেন। কার্বলিক এসিডের গন্ধে সাপ আসে না। তাই কাঁচের বোতলে কার্বলিক এসিড নিয়ে ঘরে কিংবা যেখানে থাকবেন সেখানে বোতলের মুখ খুলে রেখে দিবেন।

 

তবু এরপরেও কাউকে সাপ কামড়ে দিলে, আক্রান্ত ব্যক্তিকে স্থির করে (নড়াচড়া করলে ব্লাড সার্কুলেশন বেড়ে বিষ দ্রুত ছড়িয়ে যেতে পারে) খুব দ্রুততার সাথে আক্রান্ত স্থানের খানিকটা উপরে কাপড় বা কিছু একটা দিয়ে বেঁধে ফেলবেন। তবে খুব বেশি শক্ত করে বাঁধবেন না, তাতে অক্সিজেন প্রবাহ বন্ধ হয়ে টিস্যু ড্যামেজ হতে পারে। এরপর আক্রান্ত স্থান পরিষ্কার পানি দিয়ে ভালো করে ধুয়ে দিবেন, এবং আক্রান্ত ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ দ্রুততার সাথে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাবেন।

২# যদিও আমাদের আশেপাশের অধিকাংশ সাপই নির্বিষ, তবুও সাপ কামড়ে ফেললে সেটা বিষাক্ত কি না, তা খুঁজতে যেয়ে সময় নষ্ট করবেন না। আক্রান্ত স্থান ব্লেড বা ধারালো কিছু দিয়ে কেটে বিষ বের করার চেষ্টা করবেন না।

বিষাক্ত সাপের কামড়ে, আক্রান্ত স্থান ফুলে নীলাভ বা কালো হয়ে যায়, ছড়িয়ে যেতে থাকে। আক্রান্ত ব্যক্তি ঘুমে টলে পড়ে যেতে থাকে, চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে, শ্বাসকষ্ট হয়। কোন কোন বিষাক্ত সাপ কামড়ালে ব্যথা পাওয়া যায় না, এমনকি দাগও থাকে না। সে ব্যাপারেও খেয়াল রাখতে হবে। সাপের আক্রমণ হলে, সাপটিকে মারার ব্যাপারে উৎসাহ না দেখিয়ে তাৎক্ষণিক প্রাথমিক চিকিৎসা এবং তারপর চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত। 

৩# বন্যা কবলিত অঞ্চলে জিনিসপত্রের দাম অস্বাভাবিক রকমের বেড়ে যায়। সুতরাং ত্রাণ হিসেবে সরাসরি নগদ টাকা দেয়া সহজ বটে, তবে আরো মুদ্রাস্ফীতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই টাকা না দিয়ে ত্রাণ হিসেবে জিনিসপত্র দেয়াটা ভালো। তবে সঙ্গে কিছু পরিমাণ টাকা দেয়া উচিত। অর্থাৎ ৮০০ টাকার ত্রাণের সঙ্গে নগদ ২০০ টাকা দেয়া যেতে পারে, কিন্তু ১০০০ টাকা নগদ দিয়ে দেয়াটা সমস্যা আরও বাড়াতে পারে।

৪# শুধু সাপ নয়, মশা এবং অন্যান্য পোকামাকড় থেকেও সাবধান থাকবেন। মশানিরোধক ক্রিম (অডোমস) কিংবা স্প্রে ব্যবহার করতে পারেন।

৫# বন্যা কবলিত অঞ্চলে পানিবাহিত রোগ এবং চর্মরোগের অসম্ভব রকম প্রাদুর্ভাব হয়। সুতরাং শুধু স্যালাইন বা পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটই নয়, এসব রোগের কিছু প্রাথমিক ওষুধপত্র ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে সঙ্গে ত্রাণ হিসেবে নেয়া প্রয়োজন।

৬# চারদিকেই পানি দেখে, পানিতে সাঁতার কাটতে বা গোসল করতে না নামাই শ্রেয়। বন্যার সময় কোথাও পানির গভীরতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না, তাই নেমে বিপদে পড়তে পারেন।

৭# পানির স্রোত আছে এমন কোথাও ভুলেও নামার কিংবা হাঁটাচলার চেষ্টা করবেন না। আপনার গোড়ালি ডুবে যায় এমন পানির স্রোতই আপনাকে ভাসিয়ে নিতে পারে।

৮# স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, অর্থাৎ প্রশাসন, চেয়ারম্যান-মেম্বার, ক্লাব-সমিতি বা কোনো স্থানীয় সংগঠনের সঙ্গে কোনো ধরনের বিরোধে জড়ানো কখনোই কাম্য নয়। তারা 'টাকা পয়সা মেরে খাওয়ার তালে আছে', এমন না ভেবে একসঙ্গে সমন্বয় করলে ভালো কাজ হয়। তারা এলাকা সম্পর্কে  জানেন, এলাকার মানুষদেরও চেনেন এবং কোন এলাকা দুর্গত বা কাদের বেশি সাহায্য দরকার সেটিও ভালো বলতে পারেন।

৯# গাড়িতে থাকলেও রাস্তায় পানির স্রোত দেখলে সামনে আগাবেন না। এক ফুট পানির স্রোত আপনার গাড়িকেও ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে। গাড়ি চলাফেরা বা পার্ক করার ব্যাপারেও সতর্কতা অবলম্বন করুন, ভেঙে পড়তে পারে এমন স্থান, কালভার্ট এসব জায়গায় ভারি যানবাহন নেয়া যাবে না।

১০# ত্রাণ দিতে গিয়ে নিজে অসুস্থ হয়ে পড়বেন না। নিজের জন্য পাতলা গামছা, শর্টস এবং সহজে শুকিয়ে যায় এমন পাতলা কাপড়চোপড়, নিত্য প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র, পানির ফ্লাক্স এগুলো নিয়ে রাখবেন। পথে কোথা থেকে কিছু কিনে নিবেন এমন পরিকল্পনা না করা ভালো। প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিশুদ্ধ খাবার পানি পাওয়া কঠিন, তাই পানি সঙ্গে রাখা প্রয়োজন। ত্রাণ দেয়া মহৎ কাজ বটে, কিন্তু অতি বীরত্ব প্রদর্শন করে অন্যদেরকেই বিপদে ফেলবেন না। 

১১# খাবার পানির ব্যাপারে সতর্ক থাকবেন। টিউবওয়েলের পানিও না ফুটিয়ে পান করবেন না। পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট অথবা ফিটকিরি দিয়ে পানি বিশুদ্ধ করে নেয়াটাই শ্রেয়।

১২# বন্যা কবলিত এলাকায় অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে খাবার খুব দ্রুত নষ্ট হয়। তাই শুকনো খাবারের উপর নির্ভর করবেন।

১৩# প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেবার ব্যাপারেও খেয়াল রাখবেন, যেখানে সেখানে প্রাকৃতিক কাজ করবেন না। কারণ বন্যার সময়ে খুব দ্রুত কৃমি বা অন্যান্য পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে যায়।

১৪# সাধারণত বন্যা কবলিত এলাকায় পল্লীবিদ্যুতের সংযোগ থাকে না (এমনি সময়েও যে খুব একটা থাকে তেমনটাও জোর দিয়ে বলা যায় না), তারপরেও বিদ্যুতের খুঁটি কিংবা সংযোগ থাকতে পারে এমন কোথাও সাবধানে থাকবেন। কারণ পানির কারণে আশেপাশে জায়গাও বিদ্যুতায়িত হয়ে থাকতে পারে। 

১৫# যে কথাটি না বললেই নয়, মনে রাখবেন, ত্রাণ সংগ্রহ এবং বন্যা কবলিত এলাকায় বিতরণের ব্যাপারটা কোনো ট্যুর বা পিকনিক নয়। এখানে অকারণেই দল বেঁধে বা জাঁকজমক উপায়ে গিয়ে খরচ না বাড়ানো উচিৎ। বন্যার্তদের সাহায্য কার্যক্রমের জন্য যতটুকু সম্ভব কম টাকা খরচ করা হলে সেই টাকাটিও বন্যার্তদের সাহায্যার্থে ব্যয় করা সম্ভব। সুতরাং অযথাই দল ভারি না করে যতজন না গেলেই নয় বা যাওয়া একান্তই প্রয়োজন, ততজনের দল নিয়েই ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করুন।

গ্রাফিক্স: সালমান সাকিব শাহরিয়ার

৮২ পঠিত ... ১৬:০৮, জুলাই ২৭, ২০১৯

আরও eআরকি

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

কৌতুক

রম্য

সঙবাদ

স্যাটায়ার


Top