হুমায়ূন আহমেদ একজন ভার্সিটি স্টুডেন্ট হলে যেমন দিনলিপি লিখতে

১২২৭ পঠিত ... ১৫:৫৯, নভেম্বর ১৩, ২০১৯

হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত না, এমন কোনো বাঙালি খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা বলা মুশকিল। বিশেষ করে হল এবং ভার্সিটির ছেলেমেয়েরা সবসময়ই ছিলেন তার বড় পাঠকগোষ্ঠী, এখনও তাই। আচ্ছা ভাবুন তো, হুমায়ূন আহমেদ যদি একজন ভার্সিটির হলে থাকা শিক্ষার্থী হতেন, তার দিনলিপি কীভাবে লিখতেন? কেমন হতো ভার্সিটি পড়ুয়া হুমায়ূন আহমেদের ডায়েরি? হলের বিছানায় শুয়ে ছারপোকার কামড় খেতে খেতে তা ভেবে বের করেছেন eআরকির ভার্সিটির হল বিশেষজ্ঞরা।

 

১#
সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠা একটা বিশেষ ব্যাপার। জগতের অনেক প্রাণীই খুব সকালে ওঠে। মানুষ হিসেবে প্রাণীর মান রক্ষা করতে মাঝেমাঝে আমাকেও সকালে উঠতে হয়। দাঁত মাজতে হবে। ব্রাশ পেলাম। কিন্তু পেস্ট খুঁজে পাচ্ছি না। হলের নিয়ম এটাই, ব্রাশ খুঁজে পাওয়া গেলে পেস্ট পাওয়া যাবে না, পেস্ট পাওয়া গেলে দেখা যাবে বাথরুমে পানি নেই। বেডমেটের কাছে পেস্ট খুঁজলাম, পেয়ে গেলাম। বেডমেট হচ্ছে আমার মামার মতো। তার কাছে কিছু চাইলে পাওয়া যায়। ভাবছি তার টি-শার্টে 'Always at your service' লিখে দিলে কেমন হয়? সে উপকারী মানুষ। শুধু আমার উপকার করবে কেন? তার কাজটা সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। দেশের মানুষের উপকার করতে নিশ্চয়ই সে ভাল বোধ করবে। বেডমেটদের মতো কিছু ভালো মানুষরা সবসময় উপকার করতে পছন্দ করে।

 

২#
দাঁত ব্রাশ করছি। প্রচুর ফেনা হচ্ছে। কিছু একটা গন্ডগোল হয়েছে বুঝতে পারছি। উপকারী বেডমেট একদম 'বিল্লি মে কাট দিয়া' করে দিয়েছে মনে হয়, পেস্টের বদলে অন্য কিছু দিয়েছে। আমি থাকি হলের নতুন ভবনের ছয় তলায় থাকি আমি। এতে একটা অসুবিধা হয়েছে। নিচতলায় থাকলে জানালার পর্দা উঠিয়ে দিলেই রহিম বুঝত, ভাই ঘুম থেকে উঠেছে। দশ মিনিটের মধ্যে নাস্তা পাঠাতে হবে। তা আর হচ্ছে না। জগতের সবকিছু মন মতো হবে না, এটাই অবশ্য স্বাভাবিক। কিছু জায়গায় মানিয়ে নিতে হবে।

 

৩#
ক্লাসে যাব। বন্ধুর রুমে গেলাম। আমরা দুজন একসাথে ক্লাসে যাই। বন্ধু খাটের উপর মরার মতো ঘুমাচ্ছে। আমি আর ডাকলাম না। ঘুম হচ্ছে একটা স্বর্গীয় ব্যাপার, ঘুমন্ত মানুষকে বিরক্ত করা ঠিক না। বাংলা সাহিত্যের বস রবি ঠাকুর বলেছেন, যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চল রে। আমি না ডেকেই একলা চললাম।

 

৪#
ফারুক স্যারের ক্লাস। জাঁদরেল শিক্ষক। আমেরিকার নামকরা কোন এক বিশ্ববিদ্যালয়ে নাকি পার্টটাইম ক্লাস নেয়। ক্লাসে আসতে এক সেকেন্ডও নড়চড় হয় না। জাস্ট ইন টাইম। ক্লাসে ঢুকতে তাড়াহুড়া থাকার কারণেই সম্ভবত দুই সেকেন্ড দেরি হয়ে গেলো। স্যার আমার দিকে যে দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, তার অর্থ হলো 'ক্লাস করবি, কিন্তু এটেনডেন্স পাবি না।'

এটেনডেন্স পাওয়া না পাওয়া নিয়ে অবশ্য আজ আমার মাথাব্যথা নেই। আজ প্রেজেন্টেশন। বান্ধবী পারমিতা নীল শাড়ি পরে এসেছে। তাকে ইন্দ্রাণীর মতো লাগছে। 'বলবো না বলবো না' করেও পেছনে মাথা ঘুরিয়ে কথাটা তাকে বলতে গেলাম। সেই মূহুর্তেই ফারুক স্যারের হুংকার, গেট আউট। আমি, পারমিতা-দুজনকেই বের করে দিয়েছে। এটা একটা ভাল দিক। স্যার ছেলেমেয়ে কোন ধরনের বৈষম্য করেনি।

আমি আর পারমিতা ক্লাসের বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। পারমিতার পরনে নীল শাড়ি, আমার পরনে চেক শার্ট, ইন করা। আচ্ছা, পাঞ্জাবি পরে প্রেজেন্টেশন দেয়ার কোনো নিয়ম করা যায় না?

 

৫#
লাঞ্চ করতে হলে যাব। পারমিতাকে বললাম, প্রতিদিন তো হেঁটেই যাই, চলো আজ রিকশা নিই। পারমিতা বললো, 'এইসব ঢঙের কথা বলিস না। রিকশায় গেলে আমার হাত ধরতে পারবি। আমার হাত ধরতে তোর আজ খুব ইচ্ছে করছে। এ কারণে রিক্সায় যেতে চাচ্ছিস। মেয়েরা এইসব বুঝতে পারে, তাদের সিক্সথ সেন্স ভয়াবহ রকমের তীব্র।'

খেতে বসেছি। ডাল ওয়াসার পানির চাইতেও স্বচ্ছ। ডালের মধ্যে আমাকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। বাটি নাড়ালে আমার মাথাটাও নড়ে। ডালের মধ্যে একটা লেবু চিপে দিলাম। এখন খেতে বেশ লাগছে। বেহেশতি খাবার-দাবার।

 

৬#
এই দুপুরে অহেতুক হাঁটতে পারলে ভাল লাগত। চারিদিকে নিশ্চুপ। সবাই ভাতঘুম দিচ্ছে। নিজের মতো কিছু ভাবার সময় পাওয়া যেত। আজকাল আমাদের চিন্তাভাবনার সময় নেই। ডিজিটাল গ্যাজেট দিনের বেশিরভাগ সময় খেয়ে ফেলছে। চারিদিকে হইচই হইচই ভাব। সবার মুখে ক্লান্তির ছাপ।

কলাবাগানের রাস্তা ধরে আমি হাঁটছি, তবে অহেতুক না। আমাকে যেতে হবে টিউশনিতে।

মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদেরকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে অনেক কাজ করতে হয়। টিউশনি করানো তার মধ্যে অন্যতম। বাধ্য হয়ে টিউশনি করাই। তবে এর একটা ভাল দিক হচ্ছে নাস্তা। টিউশনি করাতে গেলে জানা যায়, পৃথিবীতে কত ধরনের বিস্কুট আছে। বিস্কুট খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলাম, 'সব পড়া হইছে?' ছাত্র মাথা নিচু করে মাথা নাড়ালো, যার দুই রকম অর্থ হয়, হ্যাঁ এবং না। সাধারণত এই ধরনের মাথা নাড়ানোর মানে হলো সে পড়েনি। গাধাটাকে আচ্ছামতো বকতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু ছাত্রের চেহারা খুবই মায়াবী। গৌতম বুদ্ধ শিশুকালে বোধহয় দেখতে এমনই ছিলেন।

আমি শিশু বুদ্ধকে আচ্ছামতো বকে দিলাম। I must be cruel, only to be kind.

 

৭#
টিউশনি শেষে হলে ফিরছি। পারমিতা কল দিয়েছিল। ধরিনি। মেসেজ করেছে, 'হলের সামনে এসে কল দিস। অনেকদিন তোর সাথে চা খাই না। তোর জন্য আজ অপরাজিতা চায়ের ব্যবস্থা করেছি। চায়ের উপরে একটা পিঁপড়া ভাসবে। তুই চুক চুক করে সেই চা খাবি। না, আসল পিঁপড়া না। আমার মামা আমেরিকা থেকে একটা লেজার লাইট নিয়ে এসেছে। আলো ফেললেই মনে হবে ওখানে একটা পিঁপড়া বসে আছে। তুই প্লিজ আসিস। প্লিজ।'
আমি ওর হলের সামনে দিয়ে আসলাম, কিন্তু কল করিনি। সবসময় সব আবেদনে সাড়া দিতে নেই। ঈশ্বরও সব আবেদনে সাড়া দেয় না, মানুষ কেন দেবে?

 

৮#
জ্যোছনা রাত। গলে গলে জোছনা পড়ছে। আমি পড়তে বসেছি, আগামীকাল মিডটার্ম। পরীক্ষার সিস্টেমটা যে চালু করেছে, তাকে দেখার আমার খুব ইচ্ছা। না, তেমন কিছুই করব না। প্রথমে মিষ্টি জর্দা দিয়ে একটা খিলিপান খাওয়াব। তারপর বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করব, 'স্যার, আমি কি আপনার গালে ঠাশ করে একটা চড় লাগানোর অনুমতি পেতে পারি? কোন ব্যথা পাবেন না স্যার। শুধু ঠাশ করে একটা আওয়াজ হবে। আই প্রমিজ স্যার।'

 

৯#
আচ্ছা, এই যে আমি পড়ালেখা করছি। এইসময়ে আমার মতো দেখতে অন্য কেউ কি একইভাবে পড়ালেখা করছে? হতেও পারে। শেক্সপিয়ার বলেছেন, There are many things in heaven and Earth.

 

১০#
ঘুমাতে যাই। বিছানার ফাঁকে লুকিয়ে থাকা ছারপোকারা খবর পেয়ে গেছে, দলে দলে উঠে আসতে শুরু করেছে। আমি তা নিয়ে বিশেষ চিন্তিত হলাম না। ঘুমিয়ে গেলেই ওদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। ঘুম হলো আরেক মৃত্যু। পার্থক্য একটাই, ঘুম থেকে ওঠা গেলেও, মৃত্যু থেকে ওঠার কোনো সিস্টেম নাই। ভাবতে অবাক লাগে, এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে একদিন আমাদের সবাইকে ঘুমের দেশে চলে যেতে হবে...

১২২৭ পঠিত ... ১৫:৫৯, নভেম্বর ১৩, ২০১৯

Top