নীলার ঘর গোছানো

৩৭৭ পঠিত ... ০০:৪৮, মে ০৩, ২০২২

Nilar-ghor-guchano

নীলা আজ ঠিক করেছে তার রুমটা গুছিয়েই ছাড়বে। গতকাল নানু তার রুমে এসে ফ্যানে ঝুলে থাকা মাকড়সার জাল দেখে তাকে অনেক অপমান করে গেছে। নানু তার ফ্যান দেখে বলেছেন, 'দেখসোনি ফ্যানটার অবস্থা! কুত্তার হুগুডি থেকেও কালা হয়া আছে।' নীলা যতদূর বোঝে হুগুডি মানে হতে পারে কুকুরের পশ্চাৎদেশ। কিন্তু পশ্চাৎদেশকে কেন হুগুডি নাম দেওয়া হয়েছে তার তা জানা নেই।

নানুকে নীলার তখন খুব বলতে ইচ্ছে করে কুকুরের হুগুডি আসলে খুব সুন্দরও হয়। কর্গি কুকুরগুলোর হুগুডির মত তুলতুলে আর পরিষ্কার পশ্চাতদেশ সে খুব কম প্রাণীর দেখেছে। কিন্তু এসব বললে কান বরাবর বনসাই খাওয়ার চান্স আছে বলে সে আর কথা বাড়ায় না। তবে এই অপমানের প্রতিশোধ সে আজকে তার ঘর গুছিয়ে, মুছে, পরিষ্কার করে নেবেই নেবে।

নীলা প্রথমেই তার টেবিলটা মুছবে বলে ঠিক করলো। কিন্তু টেবিলটা মুছতে গিয়ে সে আবিষ্কার করলো বই খাতার স্তুপ জমতে জমতে টেবিলের ওপর একটা কিলিমাঞ্জারো পাহাড় দাঁড়িয়ে গেছে। তাই সে মোছার আগে টেবিল গোছানোর উদ্যোগ নিল। টেবিল গুছাতে গিয়ে সে আবিষ্কার করলো তার বহুদিনের পুরোনো এক ডায়েরি আর একটা ফাইল। ফাইলটা খুলতেই সন্ধান পেল স্কুলের বন্ধুদের দেওয়া নানা কার্ড, গিফট, ড্রয়িং ইত্যাদির। ডায়েরিটা খুলে পড়তে পড়তে টেবিলের ওপর অযথাই পড়ে থাকা চুলের ব্যান্ড, ক্লিপ, লিপস্টিকগুলো ড্রেসিং টেবিলে রাখার জন্য নিয়ে গেল।

ড্রেসিং টেবিলের কেবিনেট খুলতেই সে আবিষ্কার করলো, একি অবস্থা! ড্রেসিং টেবিলে ফাউন্ডেশন, আইলাইনার, মাশকারা, ব্রাশগুলো যেভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা, এসব খুঁজতে গেলে মনে হবে হারাধনের গুপ্তধন খুঁজতে এসেছে বুঝি। সে ডায়রিটা সরিয়ে রেখে ঠিক করলো ড্রেসিং টেবিলটাকে টপ প্রায়োরিটি দিয়ে ড্রেস করাতে হবে! আইশ্যাডো প্যালেটগুলো গুছিয়ে রাখতে গিয়ে নীলা এবার আবিষ্কার করলো শ্যাডো বক্সের শাডো ব্রাশ রাখার জায়গাটায় বহাল তবিয়তে রয়েছে ১০ মাস আগে হারিয়ে যাওয়া তার একটা পেনড্রাইভ। পেনড্রাইভে কী আছে মনে না করতে পেরে ড্রেসিং টেবিল গোছানো বাদ দিয়ে সে গেল কম্পিউটার টেবিলে পিসি ওপেন করতে। পেনড্রাইভটা কানেক্ট করে ফাইল দেখতে গিয়ে তার চোখ আটকে গেল 'সরব' নামের এক ফোল্ডারে। মুহূর্তে নীলার নিরব মনও সরব হয়ে উঠলো। এ যে তার ১০ মাস আগে ব্রেকআপ করা বয়ফ্রেন্ডের ফোল্ডার। ব্রেকআপের পর সরবের সকল ছবি, ভিডিও একটা ফোল্ডার করে সে পেনড্রাইভে ঢুকিয়ে পেনড্রাইভটা ফেলে দিয়েছিল।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিচে তাকাতেই নীলা আবিষ্কার করলো কম্পিউটার টেবিলের নিচে জুতার বাক্সে সাদা-কালো জঞ্জালের সংসার পাতিয়ে রেখেছে চার্জার, ক্যাবল আর হেডফোনের তারেরা মিলে। আতকে উঠে নীলা আবারো গোছানোর কাজে নেমে গেল। বসে বসে তারের প্যাঁচ ছাড়াতে গিয়ে তার পিঠে যখন প্যাঁচ পড়ার অবস্থা হলো তখন একটু রেস্ট নিতে খাটে শুয়ে পড়লো নীলা। বিছানায় শুয়ে ফোনটা ধরতেই এলো নুহার মেসেজ। নীলার বেস্টফ্রেন্ড নুহা। সে বললো নীলাকে তার কলাপাতা রঙের জামাটা বের করে রাখতে, সে সন্ধ্যায় এসে নিয়ে যাবে। নীলা কলাপাতা রঙের জামা বের করতে গিয়ে আলমারিটা খুলতেই তার মুখের উপর পড়লো এক স্তুপ জামাকাপড়। দুইদিন আগে দলা করে ঠেসে যে জামা-কাপড়গুলো আলমারিতে ঢুকিয়েছিল, সেগুলো আজ সুযোগ পেয়ে বিদ্রোহ করে বেরিয়ে এসেছে। সে আবিষ্কার করলো সব বাদ দিয়ে তার আসলে এখন জামাকাপড় গোছানো উচিৎ। এভাবে গোছানোটাও হবে, সঙ্গে নুহার জন্য জামাটাও খুঁজে পাওয়া যাবে। গুছাতে গিয়ে কলাপাতা রঙের সেই জামা পেতেই নীলা নুহাকে তা জানায় আর নুহা তাকে অপর পাশ থেকে বলে, 'দোস্ত, জামাটার একটা ছবি পাঠা না প্লিইইইজ!' নীলা জামার ছবি তুলতে গিয়ে আবিষ্কার করে একি, তার বাসায় যে সুন্দর ব্যাকগ্রাউন্ড মার্কা দেয়াল নেই! দেয়ালের রংগুলোও বেশ উঠে আছে। সে ঠিক করলো নাহ! দেয়ালগুলোও ঠিক করতে হবে সঙ্গে ঘর সাজাতে আরং থেকে কিছু আয়না আর গাছও কিনে আনা লাগবে ।

যেই বলা সেই কাজ। হাফ ডান করা গুছানো আলমারির কাপড় থেকে একটা কাপড় নিয়ে সে রেডি হতে ঢুকলো বাথরুমে। ঢুকেই আবিষ্কার করলো, আর কিছুদিন গেলে তার বাথরুমটা টিএসসির বাথরুমের কাছাকাছি লেভেলে চলে যাবে। ভাবলো আজ যেহেতু ঘর পরিষ্কার অভিযানে নেমেছেই তখন বাথরুমটাও পরিষ্কার করে রাখুক। সঙ্গে গোসলটা করে একবারেই বের হবে। বাথরুমে গান শুনতে শুনতে বেসিন মাজার সময় আবারো এলো নুহার ফোন। ফোন দিয়েই নুহা বললো, 'দোস্ত, ধানমন্ডির দিকে আসবি? সবাই মিলে হুট করে প্ল্যান করলো যে খেতে যাবে। তোকে অনলাইনে পাইনা, তাই ফোন দিলাম। আয় না দোস্ত, প্লিইইইজ।' নুহার মুখে আড্ডার কথা শুনে নীলা ভাবলো আজ তো সে রুম প্রায় গুছিয়েই ফেলেছে, সঙ্গে কত কাজও করলো। হাফ ডান হলেও সেটা কাজ তো। একটু রিওয়ার্ড হিসেবে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা তো দেওয়াই যায়। ব্যস! নীলা এবার বাথরুম পরিষ্কার বাদ দিয়ে, গোসল করে, রেডি হয়ে, বেরিয়ে পড়লো ধানমন্ডির উদ্দেশ্যে। বাকি যা গোছানোর তা বাসায় ফিরে গুছাবে। তাছাড়া ঘর রং করা আর সাজানোর কথাও তো ভাবছে সে। রুমটা একেবারে নতুন করে রেনোভেট করে ফেললে কেমন হয় তাও মাথায় ঘুরছে নীলার। নাহ, একটা প্ল্যান করে আগাতে হবে। এসব ভাবতে ভাবতে ধানমন্ডি পৌঁছে গেল নীলা।

নুহা আর বন্ধুদের জন্য ওয়েট করতে করতে ফোন এলো মায়ের কাছ থেকে। নীলা ভাবলো, মা বুঝি তার আজ বড় খুশি হয়েছে মেয়ের নিজে থেকে কাজ করার উদ্যোগ দেখে। দ্রুত ফোনটা রিসিভ করতেই অপর পাশ থেকে শোনা গেল গগনবিদারী চিৎকার আর সঙ্গে গালাগালি। সবকিছুর মধ্যে থেকে নীলা মায়ের যেই কথা বুঝতে পারলো তা হলো, 'নীলার বাচ্চা, তুই রুমটার কী দশা কইরা বাইর হয়ে গেলি। এর থেকে তো কুত্তার হুগুডিও সুন্দর। এক্ষনি বাসায় আইসা রুম গুছা নাইলে তোর একদিন কী আমার একদিন।' নীলা রাগে-দুঃখে ফোন কেটে ভাবলো প্রথমে নানু আমার ফ্যানকে কুকুরের পশ্চাৎদেশের সঙ্গে তুলনা করলো, আর এখন মা আমার এত কষ্ট করে গুছানো রুমটাকেও এর সঙ্গে তুলনা করলো! নাহ, এ অপমান আর মেনে নেওয়া যাচ্ছে না। নীলা ঠিক করেছে সে আজ বাড়ি ফিরে তার রুমটা গুছিয়েই ছাড়বে!

৩৭৭ পঠিত ... ০০:৪৮, মে ০৩, ২০২২

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top