করলার চপ খেয়ে যেভাবে আমার টিউশনিটা গেলো

৫৬০ পঠিত ... ১৪:৫২, এপ্রিল ০৯, ২০২২

Korolar-chop (1)

লেখা: জান্নাতুল ফিরদৌস

রোজার সময় মাথা কাজ করে না। রোজা রেখে ঝিমঝিম করে। এরমধ্যে আবার যে বাসায় টিউশন করি সেই স্টুডেন্টের মা অদ্ভুত সব ইফতারি করান। তিনি মনে করেন দুনিয়ার যাবতীয় সব খাদ্য‌ই বেসন দিয়ে ভেজে ফেলা যায়। বেসন দিয়ে তিনি ভাজেন নাই এমন কোন বস্তু নাই। সেদিন একটা খাওয়ালেন দ‌ইয়ের বড়া। দ‌ই বরফ রাখা পাত্রে দিয়ে ফ্রিজে জমিয়েছেন, তারপর সেটা বেসন দিয়ে ভেজে ফেলেছেন। প্রতিদিন বেসন দিয়ে তিনি কি বানান সেটা গেস করাও আমার একটা কাজ। যদি ঠিকঠাক গেস করতে পারি ওনার মনটা খারাপ হয়ে যায়, ভুল গেস করলে খুশী হয়ে রেসিপি শেয়ার করেন। যদিও আমি বারবার মানা করেছি রেসিপি শেয়ার না করতে। একজন ম্যাজিশিয়ানের কখনোই উচিত না তার ম্যাজিক ট্রিক সবাইকে জানিয়ে দেয়া। যদিও ভেতরের কথা এইটা যে,আমার জানার বা বাসায় গিয়ে এইসব অদ্ভুত জিনিস ট্রাই করবার কোন ইচ্ছা নাই। যুগ যুগ ধরে আমরা বেসন দিয়ে আলু আর বেগুন ভেজে খাই। আমাদের জন্য ওটাই এনাফ। মানকচু, ঢেঁড়স, কলমি শাক, কলার চপ খাবার কোন ইচ্ছাও আমার মধ্যে নাই।

আজ তো উনি লিমিট ক্রস করে ফেললেন। ওনার আইটেম খেয়ে প্রথমেই আমার মাথায় যেটা এসেছে সেটা হচ্ছে, ‘যত‌ই বেতন দিক এই বাড়িতে আর পড়াবো না।‘

আমি আজ ওনার আইটেম ধরে ফেলেছি। মুখ বিকৃত করে বললাম, ‘এইটা করলার চপ।‘  

যেহেতু ধরে ফেলেছি ওনার মনটা খারাপ হয়ে গেছে। বললেন, ‘সেকেন্ড আইটেমটা কিছুতেই ধরতে পারবা না। ট্রাই করো।‘

আমি মুখে দিয়েই ফেলে দিলাম। বললাম, ‘এইটা বাঙ্গী। বেসন দিয়ে বাঙ্গী ভেজেছেন।‘

উনি মনমরা হয়ে চলে গেলেন। এদিকে এই বিখ্যাত দুই আইটেম খাবার পর আমার কেমন যেন নেশার মত হয়ে গেলো। মনে হচ্ছিলো ভাং খেয়েছি, ভদ্র বাংলায় যেটাকে বলে সিদ্ধির শরবত।

সিদ্ধি খেয়ে এমন‌ই সিদ্ধিলাভ করলাম যে মাথা উল্টায়ে খানিকক্ষণ পড়ে র‌ইলাম। স্টুডেন্ট এদিকে পরীক্ষা দিচ্ছে। আমার তেমন কোন কাজ নাই। হুদাই ওর মাথায় একটা থাপ্পড় দিয়ে বললাম, ‘ভালো করে লেখ।‘

সে কেঁদে ফেলার চেষ্টা করতে করতে বললো, ‘লিখছিই তো ম্যাম।‘

আরো কিছু বলার আগেই নিজেকে সামলালাম। মায়ের ওপর রাগ ছেলের ওপর দেখানোর কোনো অর্থ নাই।

হাতের কাছে ছাত্রের খাতা কলম পেয়ে চিঠি লিখতে শুরু করলাম আমার ছোটবেলার ভালোবাসাকে। হঠাৎ আজ আমাকে ভালোবাসায় পেয়ে বসেছে।

শোভন,

জানি না কেমন আছো। ব‌উ বাচ্চা নিয়ে ভালোই থাকার কথা। আমাকে কি তোমার মনে পড়ে? মনে পড়ে সেই একসাথে মাঠে কানামাছি,ওপেনটি বায়োস্কোপ খেলার কথা? মনে পড়ে একসাথে শিমুল তুলা কুড়ানোর কথা,ভুতুড়ে খালি বাড়িটাতে আম কুড়ানোর কথা? মনে পড়ে সেদিন তুমি সবচেয়ে বড় আমটা আমার হাতে তুলে দিয়ে তোমার ভালোবাসা বুঝিয়েছিলে? যেদিন আমি তোমাকে আমাদের চুরি করা লিচুর মধ্যে সবচেয়ে  মিষ্টি লিচুটা দিয়ে দিলাম সেদিন থেকে আমরা পাকাপাকি রিলেশনে চলে গেলাম। কিন্তু তারপর তোমার মা, আমার মা জানতে পেরে দুইদিন ঘরে আটকে রাখলো। টম এন্ড জেরী‌ও দেখতে দিলো না। সেই কষ্টে আমরা দুজন দুজনকে ছেড়ে দিলাম। কিন্তু ঠিক করেছিলাম বড় হয়ে আবার এক হবো। কিন্তু বড় হয়ে জানতে পারলাম তুমি তোমার ছোটবেলার খেলার সাথীকে ভালোবেসে বিয়ে করেছো! আমি তাহলে কে ছিলাম? ঐ বয়সেই তুমি দুইটা চালাইতেছিলে এটা ভাবতেই পারিনি......’

ছাত্র খাতা এগিয়ে দিয়ে বললো, ‘লেখা শেষ।‘

মাথায় আরেকটা গাট্টা মেরে বললাম, সময় নিয়ে লিখতে বলি না? ভুল হলে খবর আছে।

একটাও ভুল পাওয়া না যাওয়ায় আমি ওর মায়ের মতোই রেগে গেলাম। তারপর খাতায় ফুল মার্কস দিয়ে কোনোদিকে না তাকিয়ে হনহন করে বেরিয়ে গেলাম। ঠিক করলাম কাল থেকে ইফতারির পর আসবো। ইফতারিতে খাবার না জুটলে খেজুর খেয়ে থাকবো। এই বাড়িতে তাও আর ইফতারি করবো না। নট এনিমোর।

রাতে হঠাৎ করেই মনে পড়লো চিঠিটা ছাত্রের খাতাতেই রয়ে গেছে। দুশ্চিন্তায় সারারাত ঘুম হলো না। এখন আমার প্রেমকাহিনী সবাই জেনে যাবে। ছাত্র পর্যন্ত! ছিঃ ছিঃ কি লজ্জার কথা!

ভোরের দিকে মনে হলো,এত দুশ্চিন্তা করছি কেন? ছাত্র প্রয়োজন না পড়লে ব‌ই খাতার কাছে যায় না। আর ওর মা? সে তো আমার বন্ধুর মতো! ওনার যতো রেসিপি এ পর্যন্ত হজম করছি তার প্রতিদান কি আর দেবেন না? নিশ্চয়ই লেখাটা দেখেই ছিঁড়ে ফেলবেন,আর কাউকে বলবেন না। ছেলেকে তো দেখাবেন‌ই না। এসব বাচ্চাদের দেখানোর জিনিস না।

পরদিন দুরুদুরু বক্ষে ছাত্র পড়াতে এলাম। ইফতারির পর আসতে চাইছিলাম কিন্তু আগেই এলাম। আজ একবার বাঙ্গীর চপ খেয়ে ওর মাকে খুশী করা বিশেষ প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। ঠিক করলাম প্রতিমাসে বেতনের আগে আগে ওনার এই আইটেমগুলা আবার খেতে চাইবো। নিশ্চয়ই খুশী হয়ে তাড়াতাড়ি বেতন দিয়ে দেবেন। সেই সম্ভাবনা খুবই প্রবল।

দরজা খুলে দিলো ছাত্র। ওর দৃষ্টিটা লক্ষ্য করে অস্বাভাবিক কিছু দেখলাম না। অবশ্য এই বয়সের বাচ্চাদের এক্সপ্রেশন দেখে মনের কথা বোঝাও যায় না।

ছাত্রের মা বাসায় নেই। জিজ্ঞেস করে জানলাম আজ ওনার পাশের বাসায় ইফতারের দাওয়াত আছে। ছাত্র চলে যেতেই খাতাপত্র উল্টে কালকের খাতাটা বের করলাম। চিঠিটা নেই!

ছাত্র এসে একটা খাম ধরিয়ে দিলো। এই মাসের বেতন। অবাক হয়ে তাকাতেই বললো, ‘আম্মু বলেছে আপনার আর পড়ানোর দরকার নেই।‘

যতটা অবাক হ‌ওয়া দরকার ততটা হলাম না। উনি হয়তো ভেবেছেন ছাত্রের খাতায় যে মেয়ে প্রেমকাহিনী লেখে সে একটা বাচ্চাকে পড়ানোর অনুপযুক্ত।

তারপরেও ফর্মালিটির জন্য জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কেন? তোমার আম্মু কারণটা বলেছেন?’

ছাত্র বললো, ‘আম্মু বলতে বলেছে আমার আব্বুর ডাকনাম শোভন।‘

মুহুর্তে মনে হ‌ইলো মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়েছে। লজ্জায় বলতে ইচ্ছে করছিলো, ‘বাঙ্গির চপ নিয়ে আসো। খেয়ে নিজেকে শেষ করে দিই।‘

ছাত্রের বাড়ি থেকে বেরিয়ে পেছন ফিরে দেখি ওর আম্মু ঢুকছে। বোধহয় ইফতারের দাওয়াত ছিলো না। আমাকে ইগনোর করার জন্য।

একবার ভাবলাম ভেতরে গিয়ে বলি, ‘আপনার স্বামীকে ভুল বুঝবেন না।‘ পরমুহূর্তেই মনে হলো সবটা বুঝতে পেরে খুশীতে আজকে তরমুজের চপ খাইয়ে দিতে পারে। ঝামেলা না করে তাই পগারপার হয়ে গেলাম।

৫৬০ পঠিত ... ১৪:৫২, এপ্রিল ০৯, ২০২২

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top