বৃহস্পতিবার রাতে কেউ খালি হাতে ফেরে না

২৭৮ পঠিত ... ১৭:৩৬, জানুয়ারি ২৭, ২০২২

Bissudbar-thumb

অফিসের কাজে ঠিক মন দিতে পারছি না। বৃহস্পতিবার বিকেলটাই এমন। দুনিয়ার সবকিছুতে মন বসে শুধু অফিসের কাজ ছাড়া। অফিসের কাজকে তখন মনে হয় ভীষণ সুন্দরী এক মেয়ে, যে বেশি কথা বলে। প্রথম কিছুক্ষণ ভালো লাগে, পরে মেজাজ খারাপ হয়। কিন্তু হাতে উপায় থাকে না। বৃহস্পতিবার বিকেলে অফিসের কাজের বদলে মাটি কাটতে দিলে তাও ভালো লাগবে বলে আমার ধারণা। বসকে বিষয়টা বলে দেখা যেতে পারে। বস বিচক্ষণ মানুষ। অফিসের নতুন প্রজেক্টের মাটি কাটার কোন কাজ বেরও করে ফেলতে পারে।

এমন সময়ে বৃহস্পতিবার রাতের আমন্ত্রণসহ একটা ফোন আসলে মন্দ হতো না। কিন্ত আমি জানি ফোন আসবে না। ফোন দেয়ার মত ঢাকায় কেউ নেই। মহি ঢাকার বাইরে। শাহেদের বাসায় আজকে ওর গার্লফ্রেন্ড আসবে। রাহাতের কালও অফিস। ওর বৃহস্পতিবার রাত হয়ে গেছে শনিবার রাত। একা একা কোথাও যাওয়াও যাবে না। বৃহস্পতিবার রাত হচ্ছে ভাতৃত্বের রাত। এ রাতে একা কোথাও যাওয়া ঠিক না। এতে বৃহস্পতিবার রাতের অমর্যাদা হয়।

অতএব প্ল্যান বি। কাল শুক্রবার। শুক্রবারটা কাজে লাগাতে হবে। বাসার কী কী কাজ পড়ে আছে সে লিস্ট করা দরকার। কালকেই সব করে ফেলবো। রুমটা মুছতে হবে।এছাড়া গত একমাসের কাপড় সব ময়লা পড়ে আছে, সেগুলোও ধুয়ে ফেলতে হবে। পুরানো জীর্ন সব ধুয়ে কালই পবিত্র হয়ে যেতে হবে। এই পর্যায়ে মনে পড়ে গেলো তিন সপ্তাহ না ধোয়া মোজা জোড়ার কথা, হারামজাদারা একটু এদিক ওদিক হলে এমন গন্ধ ছড়ায় যে স্বীকারই করতে ইচ্ছা করে না যে ওগুলো আমার মোজা। এইভাবে চলা যাবে না, মোজা থেকে মাথার চুল পর্যন্ত সব ধুয়ে ফেলতে হবে।

একটা নিয়ম মাফিক জীবন আমাদের সবার যাপন করা উচিত। আর নিয়ম মাফিক জীবনের বড় শর্ত হলো, নিজের কাপড় এবং নিজেকে উভয়কে থাকতে হবে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, ওয়াশিং পাউডারের বিজ্ঞাপনের মতো।অতএব, মহান বৃহস্পতিবারের মনের দুঃখ সরিয়ে দ্রুত বাসায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম। দ্রুত বাসায় যাওয়া, দ্রুত খাওয়া দাওয়াসহ যাবতীয় কাজ সেরে সকাল সকাল ঘুমিয়ে সকাল সকাল উঠে শুরু করতে হবে মহান শুক্রবারের পাক পবিত্র হওয়ার মিশন।

 

টানা অনেকক্ষণ কাজ করে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখি ৭টা বাজে। সেটা অবশ্য সমস্যা না। কিন্তু ফোনে মিলির ৮ টা মিসড কল উঠে আছে। ৬টায় ওর সাথে দেখা করার কথা। ভুলেই গেছিলাম। বৃহস্পতিবারটাই এমন। কাজের চাপে বিবাহিত মানুষ বউয়ের কথা ভুলে যায়। আর আমি তো এই শহরের সামান্য এক গরিব প্রেমিক।

দ্রুত বের হয়ে টিএসসিতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ৮ টা। মেয়েটাকে ২ ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রেখেছি। ফোনে যথেষ্ট রাগ করেছে বলে মনে হলো না। চেহারা দেখা ছাড়া আসলে বুঝার উপায় নেই, রাগের পরিমাণ কতটা। অবশ্যই মেয়ে মানুষ চাইলে চেহারা দেখেও আপনি বুঝতে পারবেন না যে সে রাগ করেছে।

দুই কাপ চা হাতে নিয়ে মিলির কাছে গেলাম। চেহারা কিছুটা থমথমে। কিন্তু কিছু বলছে না। ও কিছু জিজ্ঞেস না করলেও ২ ঘণ্টা লেটের যথেস্ট কারণ দেখালাম। কিন্তু রিঅ্যাকশন দেখালো না। বুঝলাম, মেয়েটা অধিক রাগে পাথর হয়ে গেছে। এবং এইটাও বুঝলাম ও নিজে থেকে কোনো কথা বলবে না। আর আমিও কী নিয়ে বলবো বুঝে উঠতে পারছি না। বিষয়টা স্পর্শকাতর। অনেক্ষণ চিন্তা করে মনে হলো মিলির জামাতে ময়লা। একটু কাছে ঘেঁষে বললাম, এই তোমার জামায় তো ময়লা।

আমার দিকে এমনভাবে তাকালো মনে হলো, আমি ধানের নতুন বীজ আবিষ্কার করেছি। 

- কী বললা?

- তোমার জামাটা মনে হচ্ছে ময়লা। কাল ধুয়ে দিও। আমিও আমার ময়লা জামা কালকে ধুয়ে দিবো। আমাদের সবারই উচিত ময়লা জামা কাপড় ধুয়ে দেয়া উচিত।

- নিজের শার্ট দেখেছো? এটা যদি তুমি না পরে অপরিচিত কেউ পরতো আমি তাকে ময়লা বাবা ডাকতাম।

- এই যে ভুল বুঝলে। এটা ময়লা না, ধুলা।

- ময়লা আর ধুলার মধ্যে পার্থক্য কী?

- ধুলা হলো এখনকার ছেলে-মেয়েদের রিলেশনশিপের মতো, ফুঁ দিলে উড়ে যায়। আর ময়লা হলো আমার আমার রিলেশনশিপ, যতোই ফুঁ দাও উড়ে যাবে না। 

- কী বললে? আমাদের রিলেশনশিপ ময়লা?

- না না তা বলছি না। এটা উদাহরণ মাত্র।

- রাখো, তুমি তোমার শার্টে ফুঁ দাও।

- কিন্তু নিজের শার্টে নিজে ফুঁ দিতে দেখোছো কোনোদিন কাউকে?

- আমি জানি না, তুমি ফুঁ দিবা। নিচে টিশার্ট আছে না? শার্ট খুলে ফুঁ দিবা।

- এই টিএসসিতে শার্ট খুলে ফুঁ দিলে মানুষ কী মনে করবে।

- তুমি দিবা।

মিলির রাগে কাছে পরাজিত হয়ে আশেপাশে তাকালাম। কেউ খেয়াল করছে না দেখে টুপ করে শার্টটা খুলে আমি ফু দিলাম। কিন্তু কিছুই উড়ে গেলো না। আবার ফুঁ দিলাম। এবারও কিছু উড়ে গেলো না। মিলির চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছে আমার বোধহয় খবর আছে। পরিস্থিতি ঠাণ্ডা করার জন্য দ্রুত বললাম, আরে এতো আমাদের রিলেশনশিপ। মন্দ লোকের ফুঁ তেও কাজ হচ্ছে না। দেখেছো বেইবি আমাদের রিলেশন কতো শক্ত?   

মিলির রাগ আরো বেড়েছে বোধহয়। সে কিছু না বলে গরম গরম চা ফুরুত করে খেয়ে নিলো। ব্যাপারটা বেশ অ্যালার্মিং। দ্রুত কথা বদলালাম, ‘কাল আমার অনেক কাজ।’

- কী কাজ?

- জুতা ধোবো, মোজা ধোবো, জাঙ্গিয়া ধুবো, এমনকি আমাকেও ধোবো।  

- তাহলে বিকালে সিনেমা দেখতে যাচ্ছি না আমরা এই তো?

- সিনেমা!ও হ্যাঁ। কেনো যাবো না? অবশ্যই যাবো!  সকালে ধোবো, দুপুরে শুকাবো আর সন্ধ্যায় সিনেমা দেখবো দুইজন মিলে। কিউট না?

মিলির বিরক্তি কাটেনি। কাপে যদি আরেকটু গরম চা থাকতো সে সেইটাও ফুরুত করে খেয়ে নিতো মনে হচ্ছে।

 

৩.

মিলির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এলাকার দোকানের সামনে দাঁড়ালাম। প্রচুর ডিটারজেন্ট কেনা লাগবে। কাল যদি সব ধুয়ে পরিষ্কার করে ফেলবো। কিন্তু আমাকে দেখেই দোকানদার কিছু চিপস, বাদাম, কোক আর কয়েকটা ওয়ান টাইম গ্লাস প্যাক করে দিলো।

মন খারাপ করে বললাম, এসব লাগবে না ভাই, আমাকে আধা কেজির একটা সার্ফ এক্সেল দেন।

দোকানদার বোধয় বিশ্বাস করলো না, বিশ্বাস না করলেই কী? ডিটারজেন্ট নিয়ে রওনা দেয়ার সময় সবজির দোকানদার বললো, ভাই লেবু নিবেন না?

আমি বললাম, না লেবু লাগবে না। একশো লেবুর গুণ সমৃদ্ধ ডিটারজেন্ট নিতেছি।

বাসার কাছাকাছি আসতেই রাহাতের ফোন।

-মামা, কই?

- বাসায়।

- বাসায় মানে! আমার বাসায় চলে আয়।

- কেন?

- কাল অফিস নাই মামা। ডেডলাইন পিছাইছে। আসার সময় চিপস, কোক নিয়া আসিস।

- না রে মামা। আজকে আসবো না।

- তোর কী শরীর খারাপ?

- শরীর ঠিকই আছে।

- তাহলে সমস্যা কী? আসবি না কেনো?

- সব বৃহস্পতিবার এসব ভালো লাগে না। আর তাছাড়া কালকে আমার অনেক কাপড় ধুইতে হবে।

- আরে কাপড়তো ধুইতেই পারবি, প্রয়োজনে আমি গিয়ে তোর কাপড় ধুয়ে দিবো।

- সত্যিই?

- সত্যিই।

- তাহলে আসতেছি।

 

তড়িঘড়ি করে দোকানের দিকে গেলাম। দোকানদার আমাকে দেখেই প্যাকেট করে রাখা জিনিসপাতি হাতে দিলো।

- আপনি এইগুলো ওভাবেই রেখে দিলেন?

- হ মামা, আমি জানতাম আপনি আসবেন। বৃহস্পতিবার রাতে মওলা কাউরে খালি হাতে ফেরায় না।

আমারও তাই ধারণা, বৃহস্পতিবার রাতটাই এমন। এ রাতে যেকোন সময় ক্লাইমেক্স হাজির হতে পারে। পাকিস্তান ক্রিকেট টিমের চেয়েও আনপ্রেডিক্টেবল এই বৃহস্পতিবার রাত।

 

৪.

সকল ধরনের আহার-পান শেষে বাসায় চলে এলাম রাত একটার দিকে। রাহাত অনেক অনুরোধ করেছিলো, এখনো তো হাফ বাকি। থাইকা যা। সকালে যাইস।

- নারে মামা। আমার কাপড় ধুইতে হবে আর বিকালে মিলির সাথে সিনেমা দেখতে যাবো।

 এসেই ঘুম দিলাম। সারাদিন অনেক কাজ। ৮টায় উঠতে হবে। জামা ধুবো, রুম পরিষ্কার করবো, বিছানা চাদর ধুবো, বিকেলে মিলির সাথে সিনেমা দেখতে যাবো।

ঘুম ভাঙলো আজানের শব্দে। নিজের উপর নিজেই আশ্চর্য হয়ে গেলাম। ৮ টায় ওঠার কথা, ঘুম ভাঙলো ফজরের সময়। গতরাতের জন্য সৃষ্টিকর্তার প্রতি একটা শুকরিয়া তো আছেই। ভাবলাম, একটু শোকর গুজার করি। নামাজটা পড়েই কাজ কর্ম শুরু করবো। জামা, মোজা, বিছানা চাদর ভিজিয়ে দিবো। এরপর রুম পরিষ্কার করবো। জুতো জোড়া ধুবো।

উঠলাম। অজু করে নামাজ পড়লাম। ফোন হাতে নিয়ে দেখি মিলির ৮টা মিসড কল। মেয়েটা রাতে এত কল দিলো কেন? কোন বিপদ টিপদ হলো না তো। মাথাভর্তি টেনশন নিয়ে মিলিকে ফোন দিলাম। মিলি ফোন কেটে দিলো। আবার দিলাম। কেটে দিলো। মেয়েটার এতো রাগ।ফোন ধরতে পারিনি বলে হয়তো রাগ করে বসে আছে। আমারও কিছুটা মেজাজ খারাপ হলো। মেজাজ খারাপ করে টেলিভিশন ছাড়লাম। কি যেন একটা ইন্ট্রো দেখাচ্ছে। ইন্ট্রো শেষে অতি সুন্দরী একটা মেয়ে স্ক্রিনের সামনে এসে প্রমিত বাংলায় মধুর কন্ঠে জানালো, ‘সুধী দর্শক আপনাদের স্বাগতম শুক্রবার সন্ধ্যার খবরে, প্রথমে প্রধান প্রধান শিরোনাম . . .

২৭৮ পঠিত ... ১৭:৩৬, জানুয়ারি ২৭, ২০২২

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top