বৃহস্পতিবার আমি কারো সাথে রাগ করি না

৬৯৪ পঠিত ... ২২:৩১, নভেম্বর ১৮, ২০২১

Bisshud-bare-rag-korina

রাগটা কিছুতেই কমছে না, আর এমন রাগ নিয়ে উঠতেও ইচ্ছা করছে না। একটা বৃহস্পতিবার পুরো মাটি হয়ে গেলো কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। আরে তুই যদি আমাকে মিটিং রুম থেকে বের করে দিবি, রাত নয়টায় কেনো? সন্ধ্যা ছয়টায় বের করতে পারতি। তাহলেও তো একটা কিছু করা যেতো। কয়েক বন্ধুকে ফোন দিলাম, তারা সবাই আলাদা আলাদা ব্যস্ত। এইসব বৃহস্পতিবার রাতে পার্টির মাঝখানে প্রবেশ করাও একটা অস্বস্তিকর ব্যাপার। কী করা যায়, কী করবো এইসব যখন ভাবছিলাম তখন সাইফুল মালটার সাথে দেখা।  কথা নেই, বার্তা নেই আমার কাছে এসে জিজ্ঞেস করে, ‘ব্রো একটা বিড়ি হবে নাকি? খুব ঝামেলায় আছি। মানিব্যাগটা কোথায় যে হারিয়ে ফেললাম।'

দেখে মনে হলো লোকটার সত্যিই মানিব্যাগ হারিয়েছে।  দিলাম একটা সিগারেট। ওমা এই কথা, সেই কথায় সে আমার কাছ থেকে পরপর তিনটা সিগারেট খেয়ে ফেলেছে।  তৃতীয় সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললো, ব্রো বৃহস্পতি রাতের কিন্তু একটা ব্যাপার আছে।

- কী ব্যাপার?

- বৃহস্পতি রাতে যেকোনো কিছু হইতে পারে। 

- হুঁ

- মন খারাপ করে বললেন মনে হয়?

- আমাকে আমার বস মিটিং রুম থেকে বের করে দিছে।

- হাহাহাহা।

- হাসছেন কেনো?

- আমাকে তো আমার বউ বাসা থেকেই বের করে দিয়েছে।

- কেনো?

- আজকে বৃহস্পতিবার তাই, বৃহস্পতিবারে সে আমাকে বিশ্বাস করে না।

- কেনো?

- আপনি কি অবিবাহিত?

- হ্যাঁ।

- তাহলে বুঝবেন না

- প্রতি বৃহস্পতিবারে কি বাসা থেকে বের করে দেয়?

- সব বৃহস্পতিবার দেয় না। মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে ও নিজেই বের হয়ে যায়।

লোকটা আমার কাছ থেকে আরেকটা সিগারেট চাওয়ার আগে চলে যাওয়া উচিত, কিন্তু তার পুরো ঘটনা জানার জন্যও উশখুশ করছিলো। মনের সকল অস্বস্তি কাটিয়ে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম, ‘আজকে কী নিয়ে ঝগড়া হলো?’

- কার সাথে?

- ভাবী, মানে আপনার স্ত্রীর সাথে।

- ঝগড়া হয়নি তো। আমি বাসায় গেলাম। জিজ্ঞেস করলো অফিস শেষে কই গিয়েছিলে? বললাম মিলাদ মাহফিলে। বিশ্বাস করলো না। বললো বাসায় ঢোকার দরকার নাই। আমি বললাম ঠিক আছে।

- আপনার স্ত্রী আপনাকে বাসা থেকে বের করে দিলো আপনি কিছু বললেন না। রাগও করলেন না?

- বৃহস্পতিবারে সাধারণত আমি কারো উপর রাগ করি না। পবিত্র একটা দিন, পরদিন ছুটি। শুধু শুধু রাগ করে বৃহস্পতির ইমেজ নষ্ট করার তো কোনো মানে নেই। আপনিও রাগ করবেন না।  অফিসের বস এর উপর তো আরো না।

ভদ্রলোককে এই প্রথম আমার সন্দেহ হলো, মনে হচ্ছে এ নতুন কোনো প্রতারক অথবা মাতাল। এই শহরে প্রতারকের যেমন অভাব নেই।  বৃহস্পতিবারে মাতালেরও অভাব নাই। কাছে গিয়ে গায়ে গন্ধ আছে কিনা পরীক্ষা করলাম।  সিগারেটের গন্ধ ছাড়া তেমন কিছুই পাওয়া যাচ্ছে না। সন্দেহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি কী সত্যি মিলাদে গিয়েছিলেন?’

- অবশ্যই, পকেটে টুপি আছে দেখাতে পারি। আমার কলিগের ছেলের নাম রাখা উপলক্ষে ছোটখাটো মিলাদের আয়োজন করেছিলো, জিলাপী আর নিমকি খাওয়ালো। খুব টেস্টে। 

- এইটুকু ভাবীকে বোঝাতে পারলেন না?

- সে বোঝার অবস্থায় ছিলো না।

- কেন?

- বৃহস্পতিবার সে বোঝার অবস্থায় থাকে না।

এরমধ্যে আমরা বৃহস্পতিবার থেকে শুরু করে ছাত্ররাজনীতির একাল ওকাল, শহরে বাসের ভাড়া বৃদ্ধি, ক্রিকেটারদের বর্তমান দুরবস্থাসহ দেশের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করলাম, সে আমাকে দুইবার বললো যে, বৃহস্পতিবার ছাড়া আলাপ করেও শান্তি পাই না। ততোক্ষণে রাত অনেক হয়েছে। আমার বাড়ি যাওয়ার কথা, কিন্তু যাচ্ছি না। কারণ আমার ধারনা আমি যখনই বাসায় যাওয়ার কথা বলবো তখনই তিনি বলবেন, আমাকেও নিয়ে যান আপনার সাথে। বৃহস্পতি রাতটা থেকেই চলে যাবো।

আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম, লোকটা কখন চলে যাবে। কিন্তু সে যায় না। মাঝে মাঝে আমাকে নতুন নতুন টপিক এ কথা বলার আহবান জানায়। আমি সাড়া দেয়া কমিয়ে দিলাম। আমার নীরবতা দেখে প্রসঙ্গ পাল্টে একসময় নিজেই জিজ্ঞেস করলো, ‘ব্রো। এই শহরে বিনা ঘুমানো যাবে কোথায় বলতে পারেন?’ আমি এক প্রকার খুশি হলাম, দ্রুত জবাব দিলাম, স্টেশনে। 

- না ব্রো। বেশি বেশি হয়ে যাবে। দেখা যাবে সাংবাদিক ছবি তুলে ক্যাপশন দিয়েছে, ‘মধ্যবিত্তদের স্টেশনে ঘুমানোরই কথা ছিলো। আর কোনো অপশন?'

- আন্ডারপাস?

- না। নেশাখোরদের আর ছিনতাইকারীর আড্ডাখানা। যদিও সঙ্গে কিছু নাই।  এটাই ঝামেলা। দেখা গেলো কিছু না পেয়ে কিডনি খুলে ঢাকা মেডিকেলে বেচে দিলো।

- তাহলে ব্রো। মসজিদে চলে যান। যেকোনো এলাকার যেকোনো মসজিদে গিয়ে হুজুরকে বললেই হবে। হুজুর থাকতে দিবে।

সাইফুল সাহেব কিছুক্ষণ ভাবলেন, ভেবে বললেন, ভালো বলছেন। তবে মসজিদে যাওয়া যাবে না।

- কেন?

- একটু সমস্যা আছে।

- কী সমস্যা?

- আছে একটা সমস্যা

- কী সমস্যা বলুন। আমি দেখি সমাধান করতে পারি কিনা।

- ইয়ে করে পানি নিই নাই। 

যেহেতু এই সমস্যা সমাধানে আমার হাতে নাই তাই আমি চুপ থাকলাম। কিন্তু সে চুপ রইলো না।  তার একটা গতি করার উদ্দেশ্যেই আমি আরো চারটা জায়গার কথা বললাম যেখানে তিনি থাকতে পারবেন। কিন্তু একেকটার একেক উদ্ভট সমস্যা করলেন তিনি। 

একসময় বুঝলাম যে এই লোককে আমার সাথে না নিয়ে যাওয়া ছাড়া আমার আর কোনো উপায় নেই। ফলে আমি আর সাইফুল সাহেব হাঁটছি আমার বাসার দিকে। যদিও আমি তাকে অন্য কোথাও গছিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছি। কারণ আমি ইতোমধ্যে জেনে গেছি সন্ধ্যায় তিনি মোটেও মিলাদ মাহফিলে যান নাই। শুধু আমি না, তার দুই পায়ে উল্টা কেডস পরা এবং তার প্রতিটি পা ফেলা দেখে রাস্তায় যে কেউ বলে দিতে পারবে এই লোক কোনোভাবেই মিলাদ মাহফিলে যায় নাই।

৬৯৪ পঠিত ... ২২:৩১, নভেম্বর ১৮, ২০২১

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top