যেভাবে খেতে চাইলে খেতে দিতে হয়

৩৮১ পঠিত ... ২০:১৭, জানুয়ারি ১০, ২০২১

কয়েকদিন ধরে একটা ফকির বারবার বাসার নিচে আসছে। ছদ্মবেশী ফ্ল্যাটওয়ালা কোনো ফকির নয়, নিতান্তই হতদরিদ্র বয়স্ক লোক। ব্যাগে হাত দিয়ে খুচরা টাকা খুঁজতে খুঁজতে অনেকবার আমি বলেছি, 'চাচা মাফ করেন, স্টুডেন্ট মানুষ।'

এক কথা বলতে বলতে আমি টায়ার্ড। গত পরশুদিনের কাহিনী। টিউশনের বেতন পেয়েছি কেবল। ইউটিউব দেখে বাসায় ভালোমন্দ রান্না করছিলাম। ভাবছিলাম আজকে আমার সাথে ফকিরটাকেও খাওয়াবো। একাই থাকি আমি, খাবার টানাটানি পড়ারও কোনো সমস্যা নেই।

যথাসময়ে ফকির গেটে আসলো।

ভেতরে ডেকে সিঁড়ির কাছে বসালাম। ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম চাচা তিনদিন না খেয়ে আছেন। এই কথা শুনে খাওয়ানোর উৎসাহ দ্বিগুণ বেড়ে গেলো।

প্রথমে এপিটাইজার দিয়ে শুরু করলাম। শ্রিম্প স্যালাড। চাচা বাটির দিকে তাকিয়ে দাঁতাল হাসি দিয়ে বললেন, 'চিঙগইর মাছ...' হাসতে হাসতে চাচা এক মুহূর্তেই চিঙ্গইর মাছের বাটি সাবাড় করে ফেললো।

এরপর আনা শুরু করলাম আসল খাওয়া দাওয়া। পোলাও, সরিষা ইলিশ, মাছের দম পুখত, মুরগির রোস্ট, মুড়িঘণ্ট, বেগুন ভাজি, কালোজিরা ভর্তা, গরুর কালাভুনাসহ আরও বিভিন্ন আইটেম।

চাচা মনের আনন্দে তিন প্লেট পোলাও মাংস খেয়ে যখন উঠতে যাচ্ছেন, আমি খপাৎ করে হাতটা ধরে বললাম, 'আরে চাচা! যান কই? খাওয়া তো মাত্র শুরু... রান্না কি খারাপ হইছে?'

চাচা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে তুলতে বললেন, 'রান্না তো সেরম হইছে মা। আরোও খামু? আচ্ছা কইতেছো যখন দেও... সাগরের লাহান দিল তোমার...'

মুচকি হেসে আমি আবার সাজিয়ে গুছিয়ে নিয়ে আসলাম লুচি, হাসের মাংস, শিক কাবাব, জালি কাবাব, আফগানি জালি কাবাব, চাটনি, ভেড়ার মাংস, মাটন বিরিয়ানি, সালাদ, পুলি পিঠা, ম্যারা পিঠা, নকশী পিঠা, কলিজা ভুনা, কোয়েল ভুনা আর চমচম। একসময় চাচা খেতে খেতে ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। অসহায় কন্ঠে বললেন, 'মা, আর খাইতে পারুম না...'

আমি চোখ কপালে তুলে বললাম, 'কী বলেন চাচা! মাত্র তো শুরু...' এই পর্যায়ে চাচা যেহেতু নিজের হাতে তুলে খেতে পারছেন না, আমি নিজ হাতে খাইয়ে দেবার উদ্যোগ নিলাম। চাচাকে দেখাচ্ছিলো একটি জিইয়ে পড়া ঘোড়ার মতো, যে খেতে খেতে ক্লান্ত।

আমি আবারও পোলাও মাংস, নেহারি মানে প্রথম দিককার খাবারগুলো মাখিয়ে বালতিতে করে নিয়ে এলাম। এসে দেখি চাচা বমি করছেন হড়হড় করে। আমি রেগে গিয়ে বললাম, 'কি রে বুইড়া, খাবি না তো মাখালি কেনো? খাইতেই হবে...'

চাচার মুখটাকে হাঁ করিয়ে সেখানে খাবার ঢুকাতে লাগতাম। চাচা দেখি আর গিলতে পারছে না। এক পর্যায়ে আমি ছোটো বেলচা নিয়ে আসলাম। বেলচা দিয়ে গলা পর্যন্ত ঠেলে খাবার ঢুকাচ্ছি। একটু পর শুনি চাচার গলা দিয়ে গোঁ গোঁ শব্দ বের হচ্ছে।

আমি চোখ রগড়ে বললাম, 'সমস্যা কী? পানি খাইবেন?'

চাচা কোনোমতে মাথা দুলালো। চাচা চোখ খুলতে পারছেন না আর। পেট ফুলে ঢোল হয়ে আছে। পাজামাতেই মলমূত্র ত্যাগ করছেন। ফিরে এসে দেখি চাচা আর চোখ খুলে না। কি এক সমস্যা!

এরমধ্যে আমার বিল্ডিংয়ের লোকেরা জমা হয়ে গেলো সিঁড়ির কাছে। আমি দুঃখভরা মনে বললাম, 'The man died from over eating...'

তারা আমার কথা বিশ্বাস করলো না। পুলিশকে খবর দেওয়া হলো। আমি কিছুই বুঝলাম না। খেতে চেয়েছে, খেতে দিয়েছি, 'পুলিশ ডাকার কি আছে? বিল্ডিংয়ের বদমায়েশ লোকগুলো বিশ্বাস না করলে কি আসে যায়? পুলিশ বিশ্বাস করেছে আমি নিরপরাধ। অনাহারী লোককে খাইয়ে উপকার করার জন্য কিছুক্ষণ আগেই থানা থেকে ছেড়ে দিয়েছে।'

একটু আগেই ছাড়া পেয়েছি। ফ্রেশ হয়ে হালকা স্ন্যাকস খেয়ে লিখতে বসলাম। আরেকজন ফকির খুঁজছি খাওয়ানোর জন্য...

৩৮১ পঠিত ... ২০:১৭, জানুয়ারি ১০, ২০২১

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top