যে কারণে গোসল করতে গিয়ে আমি হাতমুখ ধুয়ে চলে আসি

২৭৩ পঠিত ... ১৮:৩৯, জানুয়ারি ০৯, ২০২১

 

ছোট থেকে প্রতিদিন গোসল করতো রাসেল। এজন্য জীবনে কম অপমান সহ্য করতে হয়নি তাকে।

রাস্তাঘাটে বের হতে পারতো না ছেলেটা। প্রচুর বুলিংয়ের শিকার হতো। আশেপাশের '১০ দিন গোসল না করা ছেলে'রা তার দিকে আঙ্গুল তুলে বলতো- দেখ দেখ, ও প্রতিদিন গোসল করে।

প্রতিদিন গোসল করে বলে ওকে কেউ খেলায় নিতো না। মহল্লার অভিভাবকেরা তাদের সন্তানদের ওর সাথে মিশতে নিষেধ করে দিতো।

স্কুলে ওর পাশে কেউ বসতো না। শিক্ষকরা ক্লাসের বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখতো। অন্যান্য শিক্ষার্থীদের বাবা-মারা স্কুলে এসে বিচার দিয়ে যেতো। ওর সাথে মিশলে নাকি ওনাদের ছেলেমেয়েরা খারাপ হয়ে যাবে। ওকে স্কুল থেকে বের করে দেয়ার কথা বলতো।

শিক্ষকরা রাসেলের বাবা-মাকে ডেকে এনে অপমান করতো। বলতো, কেমন বাবা-মা আপনারা? এই বয়সে সন্তান এভাবে প্রতিদিন গোসল করে, চোখে দেখেন না? সন্তান লালন পালন করতে না পারলে সন্তান জন্ম দিয়েছেন কেন? আপনার ছেলে যদি এভাবে প্রতিদিন গোসল করে তাহলে আমরা তাকে স্কুল থেকে বের করে দিতে বাধ্য হবো। ওর কারণে আমাদের অন্যান্য শিক্ষার্থীরা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

এভাবে ৫টা স্কুল পরিবর্তন করার পর পড়ালেখাই বন্ধ হয়ে গেলো ছেলেটার।

জেরিন নামের একটা মেয়ের সাথে প্রেম ছিলো ওর। প্রতিদিন গোসল করে বলে প্রেমটাও টিকলো না। ১৫ দিনে ১ দিন গোসল করা রাহাতের হাত ধরে চলে যাওয়ার সময় জেরিন চিৎকার করে বলেছিলো- 'শালা গরিব, ছোটলোক, কিপটা ব্যাটা। বডি স্প্রে কিনতে পারে না, প্রতিদিন গোসল করে। ক্ষ্যাত, আনকালচারড, ব্যাকডেটেড কোথাকার।'

একদিন তো রাসেলের বাবা এসে বললো, বাপ আমার, প্রতি রাতে এইসব আজেবাজে ভিডিও দেখা ছাড়। তোকে আমরা তাড়াতাড়ি বিয়ে করাবো। আর দেখিস দেখিস, তাই বলে প্রতিদিন গোসল ফরজ করে ফেলতে হবে? ৫ দিনে একদিন গোসল ফরজ করলে হয় না? তাও তো সমাজে একটু হলেও মুখ দেখানো যায়।

আঘাত এসেছিলো চরিত্রের উপরও। পাশের ফ্ল্যাটের ফয়সাল রাসেলের মতোই প্রতিদিন গোসল করতো বলে দুজনকে মিলিয়ে নানান বিশ্রী বিশ্রী অপবাদ দিয়েছিলো মহল্লার আন্টিরা। একদিন বিকেলে গোসল করে ছাদে গিয়ে রাসেল দেখে দুই আন্টি আড্ডা দিতেছে। আড্ডার টপিক সে।
- দেখছেন ভাবি, রাসেল আর ফয়সাল। ছিঃ ছিঃ।
- হ্যাঁ ভাবি। ফয়সালের পেটটা দেখছেন? মনে হয় পোয়াতি।
- কি যে বলেন না ভাবি! ছেলে তো!
- ধুর ভাবি। রাসেলের মতো প্রতিদিন গোসল করা ছেলেদের পক্ষে সবই সম্ভব।

পরিবারের মান-সম্মান বাঁচাতে ফয়সালরা এলাকা ছেড়ে চলে গেলো।

এরপরও মুক্তি পায়নি রাসেল। আশেপাশের আন্টিরা নানান কানাকানি করতো। ওর মাকে পরামর্শের ছলে নানান কথা শোনাতো। বলতো, ভাবি ছেলের দিকে নজর দিন। বিয়ের আগেই এইসব করে শরীরটা নষ্ট করে ফেললে ছেলেও হারাবেন, মান সম্মানও হারাবেন। বিয়ের আগেই স্টক শেষ হয়ে গেলে নাতি-নাতনির মুখও তো দেখতে পাবেন না। তারচেয়ে ভালো ওকে একটা বিয়ে করিয়ে দিন।

আন্টিদের পরামর্শেই রাসেলের পরিবার মিতু নামের একটা মেয়ের সাথে ওর বিয়ে দেয়।

২৭ বছরের জীবনে বিয়ের পর ২৫ দিনই সম্ভবত অবর্ণনীয় সুখের সময় কাটিয়েছিলো ছেলেটা। কোন প্রশ্নের সম্মুখীন, কানাঘুষা ছাড়া শান্তি মত গোসল করতে পারতো। কেউ কিছু বলতো না।

কিন্তু এই গোসলের সুখ রাসেলের কপালে বেশিদিন সইলো না।

বিপত্তিটা বাঁধলো বিয়ের পর শ্বশুর বাড়িতে বেড়ানোর সময়। ওর বউয়ের তখন পিরিয়ড। স্বভাব সুলভ ভাবে প্রতিদিনের মতো সেদিনও গোসল করছিলো রাসেল। ওর গোসল করা দেখেই শ্বশুর বাড়ির সবাই ক্ষেপে গেলো। 'জানোয়ার, এমন সময়েও আমাদের মেয়েটাকে ছাড়লি না' বলে টেনেহিচড়ে গোসলখানা থেকে বের করে মারতে মারতে পুলিশে দিয়ে দিয়েছিলো। তখনও হাতজোড় করে অনুনয় বিনয় করে ও বলেছিলো, আমাকে শান্তিমত গোসলটা করতে দেন। এরপর ইচ্ছামত মাইরেন।

বিরাট মামলা। নারী নির্যাতন, বিকৃত যৌন লালসা চরিতার্থসহ নাম না জানা আরো কত কি!

আদালতে রাসেলকে অপরাধী সাব্যস্ত করা হলো। ওর বউয়ের সাক্ষিতেই ১২ বছরের জেল হলো।

আদালত প্রাঙ্গনে প্রিজন ভ্যানে দাঁড়িয়ে বউকে ডেকে রাসেল বললো, 'কেউ না জানুক। তুমিতো জানো, ওই রাতে আমি তোমাকে কিছু করিনি।'
- জানি।
- তাহলে আদালতে মিথ্যে বললে কেন?
- শালা। রাতে টয়লেটের নাম করে যে রান্নাঘরে কাজের মেয়ের কাছে গেছিলি, আমি দেখিনি ভেবেছিস। আমার পিরিয়ডের সময়টা সবুর করতে পারলি না। শালা জানোয়ার।
- তুমি কীভাবে জানো আমি রান্নাঘরে গিয়েছি?
- আমি দেখেছি। অন্ধকারে কে যেন রান্নাঘরের দিকে যায়। ভেবেছিলাম অন্য কেউ। কিন্তু পরেরদিন তোর গোসল করা দেখে বুঝেছি ওটা তুই। নইলে কি আর কেউ টয়লেটে আধাঘন্টা কাটায়। এমন কনকনে ঠান্ডায় গোসল ফরজ হওয়া ছাড়া কেউ গোসল করে! এবার জেলে মর শালা।
- মিতু। ওটা আমি ছিলাম না। রাতে গোসলের নেশা উঠায় আমি আধাঘন্টা সময় নিয়ে গোসলই করছিলাম। গোসল সেরে বের হয়ে দেখি, রান্নাঘর থেকে তোমার আব্বা বের হচ্ছে।

রাসেলের শেষ কথাটি আর মিতুর কান পর্যন্ত পৌঁছালো না। ততক্ষণে প্রিজন ভ্যান জেলের পথে এগিয়ে গেলো একমাইল।

প্রতিদিন গোসল করতে গেলে রাসেলের এই করুণ পরিণতির কথা মনে পড়ে যায়। আমি আর গোসল করতে পারি না, হাতমুখ ধুয়ে চলে আসি।

২৭৩ পঠিত ... ১৮:৩৯, জানুয়ারি ০৯, ২০২১

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top