আমার গরু কেনার প্রায় দুঃসাহসিক এক অভিযান

২৩৭ পঠিত ... ১৬:১৬, জুলাই ২২, ২০২০

অলংকরণ: তাইসির

সাধারণত হাটের চতুর্দিকে বিশাল বড় ব্যানার ঝোলানো থাকে-

'হাট! হাট!! হাট!!!
বিরাট গরু-ছাগলের হাট!!!'

মাঝে নতুন এক ধোঁয়া উঠলো, হাট কি কেবল বিরাট গরু-ছাগলেরই শুধু? মাঝারি-নিম্ন মাঝারি বা ছোট সাইজের ছানাপুনেরা কী দোষ করলো?

তাই নব্য বিপ্লবী হাট-ইজারাদেরদের ব্যানারে ভাষা পরিবর্তন ঘটলো-

'হাট! হাট!! হাট!!!

গরু-ছাগলের বিরাট হাট!!!'

কয়েক বছর আগে পূর্বাচলের তিনশো ফিট রাস্তার ধারে নতুন হাটে দেখলাম ব্যানারে রেনেসাঁ যুগের প্রবর্তন এসেছে! খুব বিনয়ী ভাষায় লেখা-

'গরু-ছাগলের নিরাপদ মেলা।' 

এক জায়গায় তাতে যোগ করা- 

'আপনার নির্ঝঞ্ঝাট পশু কেনায় আমরা সারথী।'

এমন সভ্য-ভব্য আর উপকারী সারথী পেতে কে না চায়? তাই, টিপটিপ বৃষ্টির মাঝে গরু কিনতেহাজির হলাম তিনশো ফিটের নতুন হাটে।

ও আল্লাহ... হাট তো নয়, যেন সুপার স্টোরের নতুন সংস্করণ! নিরিবিলি লেকের ধারে গরুর হাট। সামনে সারি সারি গাড়ি। চন্দ্রিমা উদ্যান স্টাইলে বাঁশের ব্রিজ পেরিয়ে মনোরম পরিবেশে গরুর খুঁটি সারিবদ্ধভাবে সাজানো। চারদিকে বালি, যে কারণে বৃষ্টি হবার পরেও কোন কাদা নেই। যাও বা মাঝেমধ্যে বৃষ্টি হচ্ছে, টাঙিয়ে রাখা অসংখ্য সামিয়ানায় মাথা গুঁজলেই হলো।

এই প্রথম দেখলাম নারীবান্ধব হাট। মহিলা-পুরুষ নির্বিশেষে হাটে ঘুরে বেড়াচ্ছে, দরদামও করছে। এমনকি এক বিদেশীনিকেও দেখলাম সোনালী চুলের বাচ্চা কাঁধে গরুর হাটে ঘুরছে! গরুর হাটের এতোটা আধুনিকায়নে আমি আপ্লুত হলাম।

সমস্যা হলো, সবই আছে; খালি গরুটা নেই! নেই মানে আছে, সেটা না থাকার মতোই! চমৎকার পরিবেশ পেয়ে পিলপিল করে মানুষজন আসছে, তার তুলনায় গরুর সংখ্যা হাতে গোনা যায়! আর বাহারি সানগ্লাস পরা, দামী আংটি ঝোলানো ক্রেতাদের সামনে দামের পারদ চড়ানো হচ্ছে চরচর করে।

সন্ধ্যেবেলায় আমরা রণে ভঙ্গ দিলাম। শখের 'গরুর মেলা' ছেড়ে আমরা রওনা হলাম সবসময় যেখান থেকে কিনি- বনরূপার হাটে।

এপারে খোদাতা'য়ালা যদি বেহেস্তের নমুনা বানিয়ে রেখেছেন, ওপারে নরকের স্যাম্পল! পা রাখার পরপরই নামলো হুড়ুদ্দুম বৃষ্টি। মানুষের ভিড়ে দুই পা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকাই যেখানে কৃতিত্ত্বের কাজ, ছাতা খুলতে সেখানে আপনাকে পোলভল্টের চ্যাম্পিয়ন হতে হবে!

বর্ষণ যেখানে অবধারিত, ভেজাটা উপভোগ করাই শ্রেয়!

আমরা ভিজে ভিজেই ঘুটঘুটে অন্ধকারে পা চালালাম। পায়ের তলায় দেখি পানি। ভদ্রতা করে বললাম, আসলে এটা পানি না। এই জিনিস হল কাদা, গোবর, গরুর মূত্রের একটা সংমিশ্রণ! আমি প্রথমে শিউরে উঠে গোড়ালি পর্যন্ত প্যান্ট গুটালাম। তারপর হাঁটু পর্যন্ত। তারপর ... থাক থাক পাঠক, পরে অভব্যতার দায়ে সেন্সর বোর্ড আমায় গ্রেপ্তার করবে!

এই বড় বড় সাইজের গরু গা ঘেঁষে যাচ্ছে। আমি প্রথমে প্রথমে শিউরে শিউরে উঠতে লাগলাম। একটু পর গা-সওয়া হয়ে গেলো। তখনই ঘটলো প্রথম বিপত্তিটা। কোন এক হাতির ছদ্মবেশী গরুর আলতো ধাক্কায় ছিটকে পড়লাম তার ভুসি খাবার বালতিতে! ধাক্কার চোটে স্যান্ডেল উড়ে চলে গেছে আরেক দিগন্তে।

মামুলি স্যন্ডেল যে কতো উপকারী তা টের পেলাম এর পর। হাটুডোবা থিকথিকে গোবর, মাথার উপরে অঝোর বৃষ্টি, তার মাঝে আমি স্লিপ কেটে সাঁতরালাম মোটমাট পাঁচ থেকে ছ'বার। গরুর লাথি খেলাম তিন থেকে চারবার। আর 'কম দাম' বলার অপরাধে বিক্রেতাদের হাতে অদৃশ্য চড় খেলাম অজস্র বার! 

আর অদ্ভুত ব্যাপার! মাঝেমধ্যেই পিছন থেকে পানতোয়ার মতো ডাবর ডাবর চোখের কোন গরু এসে গাল-ঘাড় চেটে দিয়ে যাচ্ছে! ব্যাপার কী?

ব্যাপার বের করলাম নিজে নিজেই। যে পরিমাণ গরুর সাথে গা ঘেঁষাঘেষি হয়েছে, গন্ধের কারণে গরু হয়তো আর আমাতে-তার স্বজাতিতে আলাদা করতে পারছে না! গরুরা নাকি রাতকানাও হয়!!

মন্দের ভালো হলো, গরুর জিভ যে খসখসে, সেটা সেদিনই আবিষ্কার করলাম! 

শেষ পর্যন্ত অসাধ্য সাধন করে ফেললাম। কিভাবে কিভাবে যেন গরুও কেনা হয়ে গেলো। রাস্তায় দুধের বাচ্চা থেকে থুত্থুড়ে বুড়ো পর্যন্ত মহা উৎসাহে দাম জিজ্ঞেস করে গেলো, আমি গলার রগ ফুলিয়ে সমান উৎসাহে জবাব দিলাম। 

মানুষ গরু বেঁচে শান্তির ঘুম দেয়, আমরা গরু কিনে সেই ঘুমটাই তারপর দিলাম। সেই ঈদ গেছে, তারপর আরও কিছু ঈদ এসেছে, ঈদ গিয়েছে। গরু কেনার হ্যাপা মোটামুটি একই রকম থেকে গিয়েছে। 

এবারের করোনা সংক্রমণের কারণে সেইসব প্রায় দুঃসহ অ্যাডভেঞ্চারের স্মৃতিই এখন মনে হচ্ছে সুখস্মৃতি। চলে যাক দ্রুত এই খারাপ দিনগুলো। করোনামুক্ত দুনিয়ায় গরু কেনার এইসব স্মৃতি জমা হতে থাক বছরের পর বছর। 

২৩৭ পঠিত ... ১৬:১৬, জুলাই ২২, ২০২০

আরও

 
 

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top