নিঃসঙ্গতায় কেটে যাওয়া ৩০টা বছরে যেভাবে কেউ কথা রাখেনি

১০৮০ পঠিত ... ২৩:৩৯, মে ০২, ২০২০

অলংকরণ: মুবতাসিম আলভী

 

দেখতে দেখতে জীবনের ত্রিশটা বসন্ত পার করে দিলাম, কেউ প্রেমিকা হবার কথা রাখেনি।

অথচ এমনটা হবার কথা ছিলো না। ছেলে বলেন, বা প্রেমিক- দেখতে কোনোদিক থেকেই খারাপ ছিলাম না। বরং অনেকে বলতো, আমার হাসি নাকি অক্ষয় কুমারের মতো, কমেডি সিমেনায় যেমনটা সে হাসে। বন্ধুরা চোখের তুলনা দিতো রায়হান ভাইয়ের লাইভ দেখতে গিয়ে, বুক ভর্তি লোমের কথা না-ই বা বললাম। শরীরের দিক থেকেও আমি ছিমছাম, ওই যে আরেফিন শুভ বডি বানানোর আগে যেমন ছিলো আরকি। উচ্চতা নিয়েও আমার আত্মবিশ্বাস বেশ রকমের, আমির খানকে ছাড়িয়ে যেতে পারবো অনায়াসে। মাথাভর্তি চুল আছে ততটাই, যতটা থাকলে দুইমাসে একবার সেলুনে যেতে হয়। এত সম্মিলিত জিনিসপত্র নিয়েও আমার কোনো প্রেমিকা নাই-এটাই কেউ বিশ্বাস করে না। এই অবিশ্বাসই কিভাবে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে আমার প্রেমিকা ভাগ্যে- সেই গল্পটা আপনাদের সাথে শেয়ার করবো আজকে।

স্কুললাইফে আমার প্রথম প্রেম ছিলো রানু। নিয়মিত চিঠি আর ওদের ল্যান্ডফোনে মিসকল দিতে দিতে একদিন রানুর সাথে মুখোমুখি বসিবার সৌভাগ্য হলো। শরৎচন্দ্র আর উত্তমকুমারের নায়িকাদের মতো রানু আমার বুকে হাত রেখে বললো (যেহেতু ছেলেদের বুক এখনকার মতো তখন অত বেশি সেনসিটিভ বা অফেন্সিভ ছিলো না), রাকিন, তুমি ছেলে হিসেবে ভালো, যদিও তোমার শরীরে মাংস কম। কিন্তু বয়সের সাথে সাথে একদিন তোমার শরীরে মাংস হবে, আর তখন কচি কচি মাংসলোভী মেয়েরা তোমাকে নিয়ে কাড়াকাড়ি করবে। এসব দেখলে আমার মন খারাপ হবে, মরে যেতে ইচ্ছে করবে। তারচেয়ে সেই ভালো গো, আমারে না জানো, না ভালোবাসো।
সুড়সুড়ি লাগায় আমি রুনার হাতটা বুকের কাছ থেকে সরিয়ে দিয়ে বললাম, আমি কথা দিচ্ছি রুনা, আজীবন এই শরীরে মাংস লাগতে দেবো না, সবসময় উর্মিলা মাতন্ডকরের মতো ফিগার বজায় রাখবো, তবু তুমি আমাকে ছেড়ে যেও না, প্লিজ।

কিন্তু রুনা আমার অনুরোধ রাখে নাই। আমার সম্ভাব্য মাংসল শরীরের সম্ভাব্য কদর্য কাড়াকাড়ির অবাস্তব দৃশ্য কল্পনা করে সে আর যোগাযোগ রাখতে আগ্রহী ছিলো না।
মন খারাপ ছিলো অনেকদিন। তখন আমার এক বাটপার বন্ধু সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলো, ভালো রেজাল্ট করে ভালো কলেজে ভর্তি হ। দেখবি মাইয়ার ছড়াছড়ি। কারে রাইখা কার সাথে প্রেম করবি ডিসাইড করতে পারবি না। অবু, দশ, বিশ কইরা প্রেমিকা সিলেক্ট করবি তখন।

বন্ধু বাটপার হলেও পরামর্শ দিয়েছিল সততার সাথে। ফলে এসএসসি পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করে ভর্তি হলাম নটরডেম কলেজে। বাজারে তখন জোর গুজব, নটরডেমের পোলাপানদের জন্য নাকি ভিকারুন্নেসা কলেজের মেয়েরা পাগল। কিন্তু বছরখানেক কেটে যাবার পরও অপার বিস্ময়ে খেয়াল করলাম, আমার জন্য কেউ পাগল হচ্ছে না। ফলে নিজেই পাগল হবার সিদ্ধান্ত নিলাম। সকাল সন্ধ্যা দাঁড়িয়ে থাকতে শুরু করলাম ভিকারুন্নেসার সামনে। মাস তিনেক পর একজনের নজর পড়লো আমার উপর। নাম তার মিথুন।

আমাকে ভিকারুনন্নেসার গেটে প্রায়ই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে একদিন মিথুন এসে সরাসরি জানতে চাইলো, এখানে কি?
থতমত খেয়ে বললাম, আমি নটরডেমে পড়ি।
মিথুন ভ্রুঁ নাচিয়ে বললো, এইটা তো নটরডেম না, তো এইখানে দাঁড়ায়ে আছেন ক্যান? গার্লফ্রেন্ড পড়ে?
আমি ততক্ষনে একটু সামলে নিয়েছি। সাহস করে বললাম, চাঁদের যেমন নিজস্ব আলো নাই, আমারো তেমন নিজস্ব গার্লফ্রেন্ড নাই।
তারমানে অন্যের গার্লফ্রেন্ড নিয়া কারবার করেন- মুচকি হেসে বাড়ির পথে পা বাড়ালো মিথুন।
বাধ্যগত প্রেমিকের মতো আমি মিথুনের পেছন পেছন হাঁটতে লাগলাম। মিথুন একবার পেছন ফিরে তাকালো, কিন্তু কিছু বললো না। আমি জোর গলায় জানতে চাইলাম, কি ভালো লাগে আপনার?
গিফট, পারবেন দিতে?- রিকশায় উঠে যাবার আগে বলে দিলো মিথুন।
সেদিন থেকে শুরু হলো আমার সৃষ্টিশীল মিথ্যা কথার ফুলঝুড়ি, নানা অজুহাতে বাসা থেকে প্রচুর টাকা নেয়া শুরু করলাম। আর মিথুনের জন্য নিত্যনতুন গিফট কিনতে থাকলাম। একতরফাভাবে প্রচুর গিফট দেয়ার পর এক সন্ধ্যায় ভালোবাসি বলতেই মিথুন চোখমুখ কটমট করে তাকালো। জানতে চাইলো, ‘আমি কত নাম্বার’।

আমি বললাম, তুমিই আমার নাম্বার ওয়ান, শাকিব খানের কাছে যেমন অপু বিশ্বাস (মানে তখন ব্যাপারটা অমনই ছিলো, বুবলি আসার আগে।)...

মিথুন কড়া চোখে তাকিয়ে বললো, বাটপারি রাখো, নটরডেমের পোলাপানদের কাহিনী আমি জানি। আমার তিনটা ক্রাশ নটরডেমে পড়ছে, তোমরা মোগল রাজাদের মতো হেরেম চালাও দুই-তিনটা।

মিথুনের কথা শুনে আমি বোবা হয়ে গেলাম। হেরেম তো দুরের কথা, আমার যে স্রেফ একটা প্রেমও নাই, সেটা ওকে বোঝাতে পারলাম না। সেইদিনের পর থেকে মিথুন আর আমার মুখ দেখতে চায়নি। জীবনে প্রথম একটা শিক্ষা পেলাম, বাটপারির টাকায় চালানো প্রেম বেশিদিন টেকে না।

পরের ভালোবাসা এলো ভার্সিটি লাইফে। নামটি তাহার রোদেলা। রোদেলা সকাল আর দুপুরগুলোতে আমি রোদেলার পেছন পেছন ঘুরতে শুরু করলাম। ততদিনে মেয়েদের পেছনে ঘোরাঘুরিতে আমার দক্ষতা হয়ে গেছে অতুলনীয় পর্যায়ে। টানা দুইবছর নানারকম সেবামূলক সার্ভিস দিয়ে অবশেষে একদিন রোদেলার মন জয় করতে সক্ষম হলাম। পরের ছয় মাস পার্কে, রেস্টুরেন্টে পাশাপাশি বসতে শুরু করলাম দুজন। কিন্তু বসার সুযোগ পেলে তো শুতে মন চায়। তাই অনেক অনুরোধের পর রোদেলাকে নিয়ে এক বন্ধুর ফ্ল্যাটে রুম ডেটিংয়ে গেলাম, ঘন্টায় পাঁচশ টাকার চুক্তিতে। প্রথম ঘন্টায় কিছুই হলো না, রোদেলা খালি কবিতা আর গান শোনায়, আমি গোপনে গোপনে ঘড়ি দেখি, আর কত টাকা বকেয়া হলো তা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলি। হঠাৎ রোদেলা আমার চুল ধরে টান দিয়ে ওর কোলে শুইয়ে দিলো। আমি চমকে উঠলাম, একেবারে আসল জায়গা থেকে শুরু করতে হবে?

কিন্তু রোদেলা বড় নিষ্পাপ মেয়ে, আমার চুলে হাত বোলাতে বোলাতে গান শোনায়, দু:খিনী, দু:খ কোরো না। আমি বেজার মুখে শুয়ে থাকি।
হঠাৎ রোদেলা গান থামিয়ে বলে, একী, তোমার মাথায় দুইটা পাক, মানে তোমার দুইটা বিয়ে হবে?
আমি হেসে উঠি অপ্রকৃতিস্থের মতো, আরে ধুর, এগুলা কুসস্কার। রোদেলার কালো মেঘের মতো মুখ করে বললো, তুমি কি অলরেডি বিয়ে করসো একটা? নাকি আমাকে বিয়ে করবা, তারপর ডিভোর্স দিয়ে আবার অন্য কাউকে বিয়ে করবা?
আমি উত্তর দেয়ার সুযোগ পেলাম না, তার আগেই রোদেলা মরাকান্না কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে গেল, সাথে গেল আমার দেড় হাজার টাকা।

রোদেলাকে ডাকতে ডাকতে যখন পাগলের মতো ছুটে যাচ্ছি, আমার ফ্ল্যাট ভাড়া দেয়া বন্ধু দাঁত বের করে বললো, মাইয়ারে কাইন্দায়া লাইছোস? শাব্বাস বন্ধু।
সেদিনের পর থেকে রোদেলা আর সম্পর্ক রাখে নাই। আমাদের সম্পর্কের কথা পুরো ক্যাম্পাস জানতো বলে অন্য কোনো প্রেমও হয় নাই আর।

পড়াশোনা শেষ করে ব্যাংকে চাকরি পেলাম একটা। ওদিকে বাসা থেকে ক্রমাগত প্রেশার দিয়ে যাচ্ছে বিয়ের জন্য। কিন্তু আমার জেদ একটাই, সঠিক উপায়ে প্রেম না করে বিয়ে করবো না। এজন্য পরবর্তী টার্গেট হিসেবে বেছে নিলাম সুন্দরী অফিস কলিগ সোহাকে। সোহা ক্যাশ ডিভিশনে আছে, দিনরাত টাকা গোনে, শুধু আমাকে গোনায় ধরে না। তবু আমি ওর আশেপাশে ঘুরঘুর করতে থাকি, চেষ্টা করি লাঞ্চটা একসাথে করার। আস্তে আস্তে সোহা টুকটাক কথা বলতে শুরু করে, আর আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কি জানি তুকতাক করে, ফলে আমি আরো গভীর প্রেমে পড়ি তাহার। কিন্তু আপনারা নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন, আমার স্বপ্ন চাইনিজ মালের মতো, টেকেনা বেশিদিন। তাই বাড়া ভাতে ছাই ঢেলে দিতে এবার এগিয়ে আসে আমার আরেক নষ্ট কলিগ নুহাশ। সোহার সামনেই একদিন আমাকে বলে বসে, ভাই, একটা মাইয়া দেন না, কিছু একটা করি। আপনের তো মেলা কালেকশন!

আমি ঠান্ডা চোখে নুহাশের দিকে তাকিয়ে বলি, দালাল মনে হয় আমারে।

নুহাশ তার নষ্ট চোখে সোহার দিকে তাকিয়ে বলে, ভাইরে বিশ্বাস কইরেন না, হেয় কিন্তু ম্যারিড, প্লাস ভাবীর পেটে বাচ্চা আছে, হেই আচ্চার অর্ধেকটা ভাই নিজের পেটে নিয়া ঘুরে। ভুড়ি দেখেন হের।

সোহা হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে, আর আমি গড়িয়ে পড়ি পাহাড়ের চুড়া থেকে।
সোহা বলে, তাই নাকি ভাইয়া, তো এই যে আপনার প্রোফাইল পিকচারে এত লাভ রিয়েক্ট পড়ে, সুন্দরী মেয়েরা কমেন্টের বন্যা বইয়ে দেয়, ভাবী কিছু বলে না।
আমি মরিয়া হয়ে বলি, বিশ্বাস করো সোহা, ওদের সবার বয়ফ্রেন্ড আছে, বা হাসবেন্ড। কিন্তু আমার কেউ নাই। আমি বড় একা।
সোহা টেবিল থেকে উঠতে উঠতে বলে, হইসে ভাইয়া, এই মাসুম চেহারা নিয়ে আপনি আর মিথ্যা বইলেন না, হি হি।
সোহা চলে যায়। সোহারা চলে যায়। দিনশেষে আমি একা পড়ে রই।

মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে, আমার সব প্রেমিকাদের ডেকে এনে চিৎকার করে বলি, তোমরা দেখো, আমার শরীরে মাসের স্তুপ, তবু কেউ লোভী হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েনি। তোমরা আমাকে হেরেম পরিচালক হিসেবে ভাবতে পারো, কিন্তু কার্তিক আরিয়ান হিসেবে ভাবতে পারো না। মাথায় দুইটা পাক আছে দেখে ছুড়ে দিতে পারো, কিন্তু আমার বুকের ভেতর যে কষ্টগুলো পাক খেতে থাকে প্রতিনিয়ত, সেটা দেখোনা। আমার প্রোফাইল পিকচারের লাভ রিয়্যাক্ট দেখো, কিন্তু আমি লাভ করতে গেলে রিয়্যাক্ট করো উল্টাটা। তোমাদের বুকভরা অবিশ্বাস, বুঝলে না আমার বুকের ভেতর কতটা দীর্ঘশ্বাস।

মাঝে মাঝে ওয়াইফাই কাজ না করলে মার্কেসের ওই বইটা হাতে নেই- নিঃসঙ্গতার একশ বছর। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবি- আমার নিঃসঙ্গতার আর কেবল সত্তুর বছর বাকি।

১০৮০ পঠিত ... ২৩:৩৯, মে ০২, ২০২০

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top