মোটা জিলাপি আর চিকন জিলাপির মধ্যে আসলে যতটুকু তফাত

৪২৪ পঠিত ... ১৩:৫২, মে ০১, ২০২০

অলংকরণ: তাইসির

হাশেম সাহেবের বয়স সত্তরের উপরে। বয়স মেনেই শরীরে বাসা বেঁধেছে টুকটাক রোগ। ঠিক টুকটাকও বলা যায় না। প্রেশারের সমস্যা আছে। আর আছে ডায়াবেটিস। 

ডায়াবেটিসের কারণে হাশেম সাহেবের বাসায় যা ইচ্ছা খানাপিনায় নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। এটা খেতে পারেন তো ওটা খেতে পারেন না, নিয়ম মেনে মুরগির মতো খুঁটে খুঁটে ভাত-মুড়ি খেয়ে খেয়ে প্রাণ ওষ্ঠাগত! মিষ্টি খাবার মুখ তাঁর। খাবার পরে একটু দই, বা একটু সরস পানতোয়া মুখে দেয়ার চিরকালের অভ্যাস। এখন এই অভ্যাসের ব্যাত্যয় ঘটছে। খাবার শেষ করে চিরতা খাওয়া মুখ করে তিনি বসে থাকেন। কেউ তাঁকে আর এক রতি মিষ্টিও সাধে না।

তবে ইদানিং হাশেম সাহেবের আরেকটা ব্যাপারে খুব আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। সকাল বেলা নিয়ম করে কেডস পরে তিনি হাঁটতে যাচ্ছেন। এমনিতেই ভোরের পর ঘুমাতে আর ভালো লাগে না। তার থেকে ভোর ভোর বেরিয়ে পড়ে গায়ে হাওয়া লাগানোই ভালো।

ভালো লাগার আরেকটা কারণ আছে। পাড়ার মোড়ে নতুন চায়ের দোকান খুলেছে। আর কী আশ্চর্য! সকাল সকাল চা বসিয়ে ছোকরাটা জিলাপিও ভাজে! রসে টুসটুসে জিলাপি। গরম গরম জিলাপিটা ফুঁ দিয়ে ফুঁ দিয়ে মুখে পুরতে হবে শুধু। তারপরই জাদু! রসালো জিলাপিটা আপনা আপনিই মুখের ভেতর গলে গলে পড়বে। চোখ বুঁজে থেকে সেই আবেশটা নিতে হবে।

সেদিনও চোখ বুঁজে আবেশটা নিচ্ছিলেন হাশেম সাহেব। বাধ সাধলো তাঁর ছোট ছেলেটা। কোত্থেকে খবর পেয়ে পায়ে পায়ে চলে এসেছে এখানে। সবেমাত্র ভার্সিটিতে উঠলো, কী তার তেজ! এসেই মুখচোখ শক্ত করে বললো- আব্বা, বাসায় আপনার ডায়বেটিস নিয়ে আমরা চিন্তায় বাঁচি না, আর আপনে এইখানে বসে জিলাপি খাচ্ছেন?

হাশেম সাহেব বলতে চাইলেন- না না, আমি তো এইখানে এসে একটু বসলাম মাত্র। 

কিন্তু বলার সুযোগ আর পেলেন না। বলার চেষ্টা করার সময়ই মুখ থেকে আলগোছে বেরিয়ে গেছে জিলাপির একটা ভাঙা টুকরা। বমাল ধরা পড়ায় অপরাধীর মতো মুখ করে বসে রইলেন তিনি।

হাশেম সাহেবের গল্প শেষ। এবার জিলাপির গল্পে আসি। 

এই যে হাশেম সাহেব খোঁজ পেলেন রসে টুসটুসে নরম পেলব জিলাপি, সাদা বাংলায় একে আমরা কী বলি? মোটা জিলাপি। কিন্তু কতদিন হলো একে আমরা মোটা জিলাপি বলি? উত্তর হলো খুব বেশিদিন হয়নি! নব্বইয়ের দশকেও আমরা জিলাপীর প্রকারভেদ জানতাম মোটের ওপর দুই। শাহী জিলাপি আর বোম্বাই জিলাপি। 

দেশে আনাচে-কানাচে যে পুরুষ্টু জিলাপিটা আমরা দেখি, ওটাকে বলা হয়ে থাকে বোম্বাই জিলাপি। বর্তমানে একেই বলা হয়ে থাকে মোটা জিলাপি। এর মূল বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে রস। আহা... রসের আধার যেন এটি। 

কারিগররা চেষ্টা করেন আড়াই প্যাঁচে এই জিনিস বানাতে। তবে আড়াইয়ের জায়গায় তিন বা সাড়ে তিন হলেও তা নিয়ে আপত্তি থাকে না ভোজনরসিকদের। এই জিনিসই যখন বিশ প্যাঁচ দিয়ে বানানো হয়, তখন এটি পরিণত হয় শাহী জিলাপিতে। মূলত রোজার মাসে শাহী জিলাপির কদর থাকে বেশী। ওজন হিসেবে এটি বিক্রি করা হয়। আড়াই-তিন থেকে শুরু করে পাঁচ কেজি সাইজের একেকটা শাহী জিলাপি বাজারে ওঠে। অর্ডার দিয়ে আরও বেশি ওজনেরও বানিয়ে নেন অনেকে।  

বোম্বাই জিলাপির মূল উপাদান হলো ময়দা, কর্নফ্লাওয়ার, ঘন টক দই, বেকিং পাউডার, ঘি, সয়াবিন তেল, চিনি, পানি, জাফরান, গোলাপজল, এলাচগুঁড়ো, খাবার রং ইত্যাদি। আর শাহী জিলাপিতে ব্যবহার করা হয় মাসকলাইয়ের ডাল, বেসন, ঘি, ডালডা, আর ময়দা। এই জিনিসের কদর হয়ে আসছে মুঘল আমল থেকে। সম্রাট জাহাঙ্গীর তো একে এমনভাবেই লুফে নিয়েছিলেন যে, এর নামই পরিবর্তন করে রেখেছিলেন জাহাঙ্গীরা! তা সম্রাট মানুষ, নাম পরিবর্তন করতেই পারেন! সে নাম যে টেকেনি, সেটা ইতিহাসবেত্তা না হয়েও বলতে পারা যায়।

অধুনা চিকন সাইজের যে জিলাপি আমরা আদর করে খাই, এরই নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে চিকন জিলাপি। এর একটা কেতাবী নামও আছে- রেশমি জিলাপি। চিকন করে বানানোটাই কি এর মূল বৈশিষ্ট্য? কারিগররা কিন্তু বলেন ভিন্ন কথা। এর মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মচমচে ভাব। আর জন্য ময়দার সাথে যোগ করা হয় পোলাওয়ের চালের গুঁড়া। আর সাথে ঘি যদি খাঁটি হয়, তবে তো সোনায় সোহাগা! 

চিপসের মতো কুড়কুড়ে এই আঁঠালো মিষ্টির স্বাদে মাতোয়ারা ইদানিং ছেলে-বুড়ো থেকে শুরু করে সবাই। মোটা জিলাপি নাকি চিকন জিলাপি- এই তর্কে মাতোয়ারা এখন ঢাকা শহর থেকে শুরু করে মফস্বলের অলি-গলি পর্যন্ত।

যুগের সাথে তাল মিলিয়ে হয়তো আরও বৈচিত্র্য আসবে জিলাপির আকারে, গন্ধে, স্বাদে। বংশ পরম্পরায় আরও অনেক হাশেম সাহেব হয়তো ভবিষ্যতেও মত্ত হবেন জিলাপির আবেশে। মোটা কিম্বা চিকন, ডাজ সাইজ ম্যাটার? স্বাদ ম্যাটারস। 

বেঁচে থাকো হে চিকন জিলাপি। তুমিও টিকে থাকো, হে মোটা জিলাপি। 

৪২৪ পঠিত ... ১৩:৫২, মে ০১, ২০২০

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top