কোয়ারেন্টাইনেও যেভাবে ওজন এবং মেজাজ রাখবেন নাগালের মধ্যেই

৫১৩ পঠিত ... ১২:০৪, এপ্রিল ০৯, ২০২০

অলংকরণ: সালমান সাকিব শাহরিয়ার

বডি ক্লক বলে একটা কথা আছে। জানেন নিশ্চয়ই? ওই বডি ক্লক অনুযায়ীই আপনার ক্ষুধা পায়, ঘুমের সময় হাই ওঠে। হোম কোয়ারেন্টিনের দিনগুলোতে বডি ক্লক ব্যাপারটা বেশ গোলমেলে হয়ে যায়। দুপুরে খুব একটা ভাতঘুম পায়। চোখ মেলে রাখা দায়। চোখ খুলে তাকিয়ে দেখেন সন্ধ্যা। এরপর রাতে আবার ঘুম? হাহ, ঘুম জিনিসটা এতো সস্তা ভেবেছেন স্যার? উনি পরম আরাধ্য! একবার ধরা দিলেও, বারবার কি তাকে চাইলেই পাওয়া যায়? অতএব, গেলো বডি ক্লক! 

ধরে নিলাম, বডি ক্লক ব্যাপারটা আপনি ধরে রেখেছেন। আপনি ক্লক বিজয়ী। বা, নাও যদি ধরে রাখতে পারেন, বডি ক্লক ধরে রাখার ব্যাপার-স্যাপার আপনাকে বাতলে দিচ্ছি সামনেই।

গল্পের খাতিরে ধরে নিলাম আপনি সকালেই উঠছেন। উঠে আড়মোড়া ভাংবেন নিয়মমতোই। তারপর? তারপর অতি অবশ্যই এই ছড়াটা বিড়বিড় করবেন-

সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি
সারাদিন আমি যেন কম কথা বলি। 

কেন কম কথা বলবেন? কোয়ারেন্টিনে তো কয়েকটা দিন কেটে গেলো। টের পাননি এই কয়দিনেও? কয়টা কাপ-পিরিচ ভেঙেছেন বাসায় এই কয়দিনে? বা, কয়বার রাগ করে নাওয়া-খাওয়া বাদ দিয়েছেন? বেশি বেশি যে কোন জিনিসই ভালো লাগে না, এমনকি স্বর্গতূল্য ঘরে থাকাও, সেটা আপনার চেয়ে বেশি এখন কে জানে বলেন? এই সব কিছুর মূল উৎস হচ্ছে কথা। এই জিনিস যতো কম বলতে পারেন, গৃহশান্তির জন্য সেটা ততোই ভালো।

ঘুম থেকে উঠেই চুলায় চড়িয়ে দিন পানি। চা খাবেন? একটু পরে খান? এই পানিটা আপনি গরম গরম এমনিই খাবেন খালিপেটে। কেন? আর ভাই, বসে বসে খেয়ে কোমর কী পরিমাণ থলথলে হয়ে যাবে হিসেব আছে? কী বললেন? কেয়ার করেন না? যান যান, আপনাকে বোঝানোর অত সময় তাহলে নেই! 

ওহ, কেয়ার করেন বলছেন? তাহলে পানি চড়িয়ে মিনিট পনেরো আপনার মতো করে সময় নিন। তাতে ফ্রেশ হতে পারেন, জানালাটা একটু খুলে সকালে বাতাসটা বুক ভরে নিতে পারেন- আপনার ব্যাপার। এইবার সোনামুখ করে কুসুম গরম পানিটা খেয়ে নিন। শরীরে একটা চনমনে ভাব আসবে, গলার খুশখুশে ভাব দূর হবে, পেটের চর্বি কাটতে সহায়তা করবে। তবে একদিন পানি খেলেই হবে না। এটা চালিয়ে যেতে হবে নিয়মিতভাবে।

এইবার একটা অন্যরকম কাজ করুন। অন্তত বিশ কদম নির্বিঘ্নে হাঁটা যায়, বাসার ভেতর এমন একটা জায়গা বের করুন। হাঁটার পথে যদি পায়ে বাঁধে এমন কোন জিনিস পড়ে, সেটা আধঘণ্টার জন্য সরিয়ে রাখুন। এরপর কেডস পরে ফেলুন। গৃহশান্তি বজায় রাখতে কেডসের তলা অবশ্যই ময়লামুক্ত করে নিন। নাহলে পরে তুলকালাম লেগে যেতে পারে।

এরপর ওই বিশকদম হাঁটুন। হাঁটা যাচ্ছে? তাহলে টার্ন ব্যাক করে বিশ কদম যান। এইভাবে আধাঘণ্টা একই রুটে হাঁটাহাঁটি করুন। লজ্জা-টজ্জা পাবেন না আবার। এই হাঁটা আপনার সার দিনটাকেই চাঙ্গা করে দেবে। এয়ারফোনে শুনতে পারেন পছন্দের কোন গান, বা মোবাইলেই দেখা শুরু করতে পারেন না দেখা কোন মুভি। বিশ্বাস করেন, আধাঘণ্টা কোনদিক দিয়ে উড়ে যাবে টেরই পাবেন না। 

হাঁটা শেষ করে গোসল করে নিতে পারেন। তৈরী হয়ে নিন সারাদিনের জন্য। স্যুটেড বুটেড হতে যদি ভালো নাও লাগে, অন্তত ঘুমের পোষাকটা আবার গায়ে জড়াবেন না। রিল্যাক্স থাকা যায় এমন জামা পরলেই হয়, তবে হুট করে ভিডিও মিটিঙে বসতে হলে যেন জামা পরার জন্য দৌড়াদৌড়ি করতে না হয়। 

বাসার সবার জন্য নাশতার ব্যাপারটা দায়িত্বে নিতে পারেন। নিজেরও ভাল্লাগবে, বাকীরাও খুশি হবে। নাশতায় যেটাই খান, ফল রাখবেন তালিকায়। এই সময়ে ফল ফ্রুট খাওয়াটা জরুরী। বিশেষ করে শরীরের ইমিউন সিস্টেমের জন্য। ওটাই এই দিনে আপনার রক্ষকবজ। কমলা খাওয়ার চেষ্টা করুন, বা ভিটামিন সি জাতীয় অন্য কোন ফল। করোনা জাতীয় ভাইরাস প্রতিরোধে এই ভিটামিন হবে আপনার জন্য লড়ে যাওয়া যোদ্ধা। একটু খবরের চোখ বুলিয়ে নিতে পারেন এই সময়ে।  

এরপর কাজে বসুন। সারাদিনের কাজের প্ল্যান করে নিন দিনের শুরুতেই। অন্তত ঘণ্টাতিনেক নাক-কান বুঁজে কাজ করে যান। বেতনটা হালাল করুন। বা, ব্যবসায়ের আয় সমাগমটা নিশ্চিত করুন। এর মাঝে কেয়ামত ঘটে গেলেও যেন আপনার মনোযোগ এদিকেই থাকে। অবশ্য, সত্যিসত্যিই কেয়ামত ঘটে গেলে অবশ্য ভিন্ন কথা।  

এরপর কাজের অবস্থা বুঝে আপনি টাইট বা রিল্যাক্স দিতে পারেন। আগেরদিনই একটা ধারণা করে নিতে পারেন- বাসার কোন কোন কাজগুলি আপনার করতে হবে আজকে। বেশিরভাগ বাসাতেই এখন হেল্পিং হ্যান্ড আসা বন্ধ। ধরে নিলাম আপনার বাসাতেও নেই। কাজেই, কোন কাজটা আপনি করবেন সেটা নিশ্চয়ই বুঝে নিয়েছেন। হতে পারে সেটা ঘর পরিষ্কার করা, বা কাপড় ধোয়া, বা বাচ্চাকে খাওয়ানো, কিম্বা লাঞ্চ বা ডিনারের আয়োজন করা। অফিসের কাজে একঘেঁয়েমি লাগলে টুক করে ঘণ্টাখানেকের জন্য সেরে আসতে পারেন সেটা। কাজ বুঝে অবশ্য। আর একঘণ্টার জন্য উঠলে সেটা বসকে না জানালেও পারেন। দুনিয়ায় সবাই সবকিছু না জানলেও চলে! 

দুপুরে সবাই একসাথেই খেতে বসুন। কোয়ারেন্টাইন থেকেও ভালো কিছু পাওয়া সম্ভব, সেটা আপনি আদায় করে নেবেন না কেন বলুন? খাবার পরে সবার সাথে একটু কথাবার্তা বলতে পারেন। দেশ ও সমাজের অবস্থা দেখে নিতে পারেন অনলাইনে। বা টুক করে ফেসবুক দেখে মাথা গরম করেও ফেলতে পারেন। আপনার ইচ্ছা। 

এইবার একটা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। ভাতঘুমের চ্যালেঞ্জ! প্রবল আলস্যে চোখ একেবারে বুঁজে আসবে। যদি আপনি ঘুমিয়ে যান, সম্ভবত বডিক্লক চ্যালেঞ্জে আপনি শেষ। দুপুরের ঘুমটাই বেশিরিভাগের বডিক্লক নাড়িয়ে দেয়ার জন্য দায়ী। আর যদি ভাতঘুম এড়াতে পারেন- তবেই আপনি বাংলাদেশ! এই সময়ে হালকা ধরনের কোন কাজ করলে ভালো। অফিসিয়াল যোগাযোগগুলিও এই সময়ে করতে পারলে ভালো। যদি যার সাথে যোগাযোগ করবেন, তিনি ভাতঘুমে না থাকেন আরকি। 

বিকেলবেলায় পারিবারিক চা-চক্রে যোগ দিন। তবে, চায়ের সঙ্গে ‘টা’ খানি এড়িয়ে গেলেই বেশি ভালো। সন্ধ্যাবেলাতেই ডিনারের পাট চুকিয়ে ফেলার চ্যালেঞ্জ সামনে। কী বললেন? আপনি সন্ধ্যায় ডিনার করলে রাতে আবার খেতে হবে? খান ভাই, আরাম করে খান। ছুটির দিনে বসে বসে খেয়ে আপনি মুটিয়ে গেলে আমার কী?

আরেকটা কথা। সকালবেলায় বিড়বিড় করা ছড়াটা ভুলে যাবেন না যেন। টানা বেশ কিছুদিন কোয়ারেন্টিনে থেকে বেশিরভাগই এখন তিরিক্ষি মেজাজে আছেন। হুট করে যে কোন বাক্যে তাদের ধৈর্য্যের বাধে জোয়ারের ধাক্কা লাগতে পারে। অতএব, সাবধান!

রাতের খাবার খেয়ে নিন সন্ধ্যাবেলাতেই। এই জিনিসটা অভ্যাস না থাকলে বেশ কঠিন। তবে, চেষ্টা করতে দোষ কী? কয়েকদিন হালকা জাতীয় ডিনার খাবার চেষ্টা করুন। বিশ্বাস করুন, শরীরটাই অন্যরকম ফুরফুরা হয়ে যাবে। এরপর ম্যান, আপনার সময়। যা ইচ্ছা করুন। ঘরের কাজ করুন, পার্টনারকে সময় দিন, কোন না পড়া বই, অনেকদিনের জমানো মুভি- কতরকম অপশন! 

শুধু একটা ব্যাপার- রাতে সময়মতো ঘুমাতে ভুলবেন না। অনেকে ঘুমাতে ঘুমাতে সারারাতই পার করে ফেলেন। এরপর বডিক্লক আপনাকে দেখে খিকখিক করে হাসবেই শুধু।

এইভাবে চললেই কি আপনি হয়ে উঠবেন দিগ্বিবিজয়ী আলেকজান্ডার? উঁহু, সে নিশ্চয়তা কেউ আপনাকে দিচ্ছে না। কিন্তু, এই অসহনীয় কোয়েরেন্টিনের চাপ যে আপনি অন্যদের থেকে সহজভাবে নিতে পারবেন, সেটা হলপ করেই বলা যায়। 

৫১৩ পঠিত ... ১২:০৪, এপ্রিল ০৯, ২০২০

আরও

পাঠকের মন্তব্য

 

ইহাতে মন্তব্য প্রদান বন্ধ রয়েছে

আপনার পরিচয় গোপন রাখতে
আমি নীতিমালা মেনে মন্তব্য করছি।

আইডিয়া

গল্প

সঙবাদ

সাক্ষাৎকারকি

স্যাটায়ার


Top